যোধপুর, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: রাজস্থানের মরুভূমির বুকে এমন এক মন্দির রয়েছে, যেখানে ধর্মের পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে শতাব্দীপ্রাচীন এক সম্পর্ক। যোধপুরের বাগোরিয়া গ্রামের বাগোরিয়া মাতাজি মন্দিরে প্রায় ৬০০ বছর ধরে চলে আসছে এক বিস্ময়কর ঐতিহ্য। মন্দিরের দেবী হিন্দু, কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁর পুজো-অর্চনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন একটি মুসলিম পরিবার।
বাগোরিয়া মাতাজি মন্দিরটি যোধপুর জেলার ভোপালগড় তহশিলের বাগোরিয়া গ্রামে। স্থানীয় ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সিন্ধ থেকে আসা ওই মুসলিম পরিবারের প্রায় ১৪ প্রজন্ম ধরে মন্দিরটির সঙ্গে সম্পর্ক। তাঁদের পূর্বপুরুষেরা কী ভাবে এই মন্দিরের সেবায় যুক্ত হলেন, তার লিখিত ইতিহাস খুব বেশি নেই। রয়েছে মূলত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোককথা।
সেই গল্প অনুযায়ী, বহু বছর আগে সিন্ধ থেকে উটের কাফেলা নিয়ে রাজস্থানের দিকে আসছিলেন পরিবারের পূর্বপুরুষেরা। পথে কয়েকটি উট অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন তাঁরা বাগোরিয়ার কাছে থামেন এবং স্থানীয় দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন। বিশ্বাস, দেবীর আশীর্বাদে অসুস্থ উটগুলি সুস্থ হয়ে ওঠে।
আর একটি লোককথায় বলা হয়, খাদ্য ও জলের সংকটে পড়েছিলেন পরিবারের পূর্বপুরুষেরা। সেই সময় এক ব্যক্তি স্বপ্নে দেবীকে দেখেন। দেবী তাঁকে একটি কুয়োর পথ দেখান। পরে সেই কুয়োর কাছে দেবীর মূর্তি পাওয়া যায় বলেও স্থানীয় বিশ্বাস। সেই ঘটনার পরই দেবীর সেবা করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। তার পর কেটে গিয়েছে শতাব্দী। প্রজন্ম বদলেছে। সময় বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি সেই দায়িত্ব।
আজও পরিবারের সদস্যেরা মন্দিরে পুজো, আরতি, ভোগ-সহ বিভিন্ন প্রচলিত আচার পালন করেন। একই সঙ্গে নিজেদের ইসলামি পরিচয়ও বজায় রেখেছেন। তাঁরা নামাজ পড়েন, ইসলামি রীতিনীতি মেনে চলেন। অর্থাৎ একই জীবনে পাশাপাশি রয়েছে দুই ভিন্ন ধর্মীয় পরম্পরা।
এই মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত পরিবারের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন জামালউদ্দিন খান, স্থানীয় ভাবে যিনি ‘ভোপাজি’ নামে পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘ জীবন তিনি বাগোরিয়া মাতার সেবায় কাটিয়েছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে তাঁর মৃত্যু ফের এই অনন্য ঐতিহ্যকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
স্থানীয় মানুষের কাছে অবশ্য বিষয়টি কোনও বিরোধের নয়। কে হিন্দু, কে মুসলিম—তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মন্দিরের সঙ্গে পরিবারের দীর্ঘ সম্পর্ক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দায়িত্ব পালন করাই তাঁদের কাছে ঐতিহ্য। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও এই মন্দিরে আসেন।
মন্দিরটি একটি পাহাড়ের উপরে। সেখানে পৌঁছতে প্রায় ৫০০ ধাপ সিঁড়ি ভাঙতে হয়। যোধপুর শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। পাহাড়ের উপর থাকা মন্দিরের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে একটি প্রাচীন বাওড়িও।
বাগোরিয়া মাতাজি মন্দির তাই শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়। রাজস্থানের লোকসংস্কৃতির এমন এক জীবন্ত দলিল, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে গিয়েছে সহাবস্থান। নামাজের হাত আরতির প্রদীপ জ্বালিয়েছে, আর সেই আলোয় তৈরি হয়েছে এমন এক গল্প, যা ধর্মের সীমানার চেয়েও অনেক বড়।