অঙ্কন দাস: শিক্ষার্থী যদি অর্জুন হন তবে গুরু হিসেবে খ্যাতি পাবেন যদুকূলপতি শ্রীকৃষ্ণ। তাঁকে বর্ণনা করা এক কথায় অসাধ্য। কোন রুপে তিনি প্রতিভাত হননি? সকল রূপেই তাকে পাওয়া গিয়েছে। কখনো বাঁশির সুরে মাতিয়ে রেখেছেন সমগ্র নন্দগাঁও। কখনো গীতার জ্ঞানে শিক্ষিত করেছেন আপামর বিশ্ববাসীকে। এক হাতে ধরেছেন মুরলী, অন্য হাতে ধরেছেন সুদর্শন চক্র। তাঁর মিষ্টি কথায় একদিকে জগৎ হয়েছে মুগ্ধ। আবার তাঁর'ই কড়া পদক্ষেপে দমন হয়েছেন মথুরাপতি অত্যাচারী কংস।
তার জন্মটাই বড় রহস্যজনক। তাঁর জন্মের আগে তাঁর মামা কংস তার মা দেবকী এবং বাবা বাসুদেব কে বন্ধ করে রেখেছিলেন কারাগারে। কংস জেনেছিলেন তাঁর আদরের বোন দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান নাকি কংসের মৃত্যুর কারণ হবেন! আর তাই প্রাণভয়ে প্রথম থেকেই তিনি হয়ে উঠলেন নির্মম। দেবকীর একের পর এক সন্তানকে কারাগারের দেয়ালে ছুঁড়ে ছুঁড়ে হত্যা করতে লাগলেন নির্মম অত্যাচারী মথুরাপতি। অবশেষে জন্মালেন তিনি। কৃষ্ণ জন্মের পর মহামায়ার মহা-মায়ায় অত্যাচারী কংস সবথেকে বড় বিপদের সম্মুখীন হলেন। মহামায়া কংসকে সাবধান বার্তা দিয়ে গেলেন 'তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।'
রাজনীতিজ্ঞ এবং কূটনীতিজ্ঞ হিসেবে কৃষ্ণ বারংবার প্রকাশিত হন এক বিশেষ প্রতিভা রূপে। কূটনীতিজ্ঞ হিসেবে তার প্রথম আত্মপ্রকাশ ইন্দ্রপূজা'র বিরোধিতায়। এরপর দ্বিতীয় সাফল্য আসে অত্যাচারী কংসকে তারই সিংহাসনের সামনে, জনগণকে সাক্ষী রেখে হত্যা করায়। তৃতীয় এবং চতুর্থ বার কূটনীতিজ্ঞ হিসেবে তিনি নিজের প্রমাণ দেন খান্ডববন দহন এবং যাদব কন্যা সুভদ্রার সঙ্গে চন্দ্র বংশীয় তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের বিবাহতে। যুগ বদলের ডাক দিলেন গুরু সান্দীপানির সবথেকে উজ্জ্বলতম শিষ্য, শ্রীকৃষ্ণ।
রাজনীতিক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন মথুরায় রাজ্যপাট হওয়া সত্বেও দ্বারকাতে রাজ্য স্থানান্তরে। এর পরের প্রমাণ দেন তিনি দ্বিতীয় পান্ডব মহাবল ভীম কে দিয়ে মগধরাজ জরাসন্ধকে হত্যা করায়। এরপরের এবং সব থেকে বড় প্রমাণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। যেখানে তিনি নিজে শান্তি দূত হিসেবে হস্তিনাপুরের রাজসভায় গিয়ে শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এবং চেয়েছিলেন যাতে এই যুদ্ধই না হয়। কিন্তু অহংকারী দুর্যোধনের অহংকারের কারণেই এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু, তাঁর সামর্থ্যের সামনে, দুর্যোধনের অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। কারন, তিনি যে যুগনায়ক।
শ্রীকৃষ্ণ চেয়েছিলেন সমগ্র দেশকে এক ছাতার তলায় এক রাজনীতির তলায় নিয়ে আসতে। কিন্তু তৎকালীন সময়ে সে জিনিস সম্ভব ছিল না। এর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মগধরাজ জরাসন্ধ, চেদিরাজ শিশুপাল, পুণ্ড্ররাজ পৌণ্ড্রক, প্রাগজ্যোতিষরাজ নরকাসুর এবং তাদের বিরোধী জোট রাজনীতি। এছাড়াও তৎকালীন সময়ে কাশী,পাঞ্চাল, হস্তিনাপুর,মৎস্য, সিন্ধু, গান্ধার- প্রত্যেকটি রাজ্য ছিল স্বতন্ত্র চিন্তা ভাবনায় বিশ্বাসী। যার ফলে এই বিরোধী জোট এবং পারস্পরিক শত্রু রাজ্যগুলি কোন মতেই নিজেদের একসূত্রে গাঁথতে পারেনি! আর তাই তিনি সমস্ত রাজ্য এবং তাদের জোট শক্তিগুলিকে একত্রিত করার জন্যই বোধহয় এই মহাযুদ্ধের অবতারণা করতে বাধ্য হয়েছিলেন!
কৃষ্ণ যুগ কেটে যায়, কিন্তু সততই তিনি থেকে যান মানুষের মনে। তার জন্য পাগল হন গেরস্থ ঘরের বউ শ্রীরাধিকা থেকে এক রাজ্যের রানী মীরা। তার খোঁজে ঘরছেড়ে, সংসার ত্যাগী হন বাংলার ঘরের ছেলে, মহাপণ্ডিত শ্রীচৈতন্য! তাকে নিয়ে লেখা হয় অমর সব কথা এবং কাহিনীর ঠাস-বুনন। সেইসব অমর লেখার তরণী ভাসান কবি জয়দেব থেকে শুরু করে বিদ্যাপতি হয়ে বড়ু চন্ডীদাস। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছরেরও আগে এক মহামানব জন্ম নিয়েছিলেন। যার জন্য মানুষ যুগ যুগান্তর ধরে অপেক্ষা করে থাকে। তাঁকে জানাই বিনম্র ভক্তিপূর্ণ শ্রদ্ধার্ঘ্য। তাঁরই জন্য বলতে ইচ্ছা করে - ‘মনমোহন কানহা বিনতি করু দিন রৈন!’