শ্রীহরিকোটা: এক সময় নাম হয়েছিল ‘নটি বয়’। কখনও ঠিকঠাক কাজ করেছে, কখনও আবার শেষ মুহূর্তে মুখ ফিরিয়েছে। ব্যর্থতার ধাক্কায় প্রশ্ন উঠেছিল ভারতের ভারী রকেট প্রযুক্তি নিয়েও। কিন্তু সেই ‘দুষ্টু ছেলে’ই এ বার যেন বদলে গেল। নির্ধারিত সময়ে আকাশ ফুঁড়ে উঠে সফল ভাবে উপগ্রহকে কক্ষপথে পৌঁছে দিয়ে ফের আস্থা ফেরাল ইসরোর GSLV। ভারতের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে যোগ হল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
শুক্রবার ভোরে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ কেন্দ্র থেকে GSLV-F17-এর সফল উৎক্ষেপণ ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিশেষ প্রত্যাশা। উৎক্ষেপণের পর একের পর এক ধাপ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করে রকেট। শেষ পর্যন্ত EOS-05-কে নির্দিষ্ট ট্রান্সফার অরবিটে পৌঁছে দেয় সেটি। এর পর নিজস্ব প্রপালশন ব্যবস্থার সাহায্যে উপগ্রহটি পৌঁছবে জিওস্টেশনারি কক্ষপথে—পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায়।
কিন্তু এই উৎক্ষেপণের গুরুত্ব শুধু আর একটি সফল রকেট উৎক্ষেপণে সীমাবদ্ধ নয়। EOS-05 ভারতের নতুন প্রজন্মের পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ। জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে এটি। ফলে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ থেকে কৃষি, জলসম্পদ, বনাঞ্চল এবং দুর্যোগ মোকাবিলা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এই উপগ্রহের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইসরোর জন্য অবশ্য GSLV-F17-এর সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরনো স্মৃতিও। GSLV-কে ‘নটি বয়’ বলা শুরু হয়েছিল তার আগের কয়েকটি অনিয়মিত পারফরম্যান্সের কারণে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলির একটি এসেছিল ২০২১ সালে। GSLV-F10-এর উৎক্ষেপণ সফল হয়নি। EOS-03-কে কক্ষপথে পৌঁছে দেওয়ার সেই অভিযান শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। ফলে ভারতের ভারী উপগ্রহ উৎক্ষেপণ প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছিল।
সেই ব্যর্থতার পরে অবশ্য থেমে থাকেনি ইসরো। রকেটের বিভিন্ন ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয়েছে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে, পরীক্ষা হয়েছে বার বার। ধীরে ধীরে GSLV তার নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ দিতে শুরু করে। প্রতিটি সফল উৎক্ষেপণের সঙ্গে মুছে যেতে থাকে পুরনো ব্যর্থতার দাগ।
এ বারের অভিযানে তাই রকেটের প্রতিটি ধাপের দিকে ছিল বাড়তি নজর। GSLV-F17 প্রায় ৫১.৭ মিটার লম্বা। তিন ধাপের এই রকেটের প্রথম ধাপে কঠিন জ্বালানি, দ্বিতীয় ধাপে তরল জ্বালানি এবং তৃতীয় ধাপে ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। ভারী উপগ্রহকে জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথে পাঠানোর ক্ষেত্রে এই ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তিই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
আর সেখানেই ভারতের সাফল্যের আলাদা তাৎপর্য। পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে উপগ্রহ পাঠানোর তুলনায় জিওস্টেশনারি কক্ষপথে উপগ্রহ পাঠানো অনেক বেশি কঠিন। রকেটকে শুধু উপগ্রহকে উপরে তুললেই হয় না, নির্দিষ্ট গতি ও দিক বজায় রেখে তাকে এমন একটি কক্ষপথে পৌঁছে দিতে হয়, যেখান থেকে উপগ্রহটি পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে পারে।
EOS-05 সেই কারণেই ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া তথ্য আগামী দিনে বহু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। কৃষিজমির পরিস্থিতি বোঝা, প্রাকৃতিক সম্পদের নজরদারি, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের আগে ও পরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই মহাকাশভিত্তিক তথ্যের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে।
আর একটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যত বেশি ভারী উপগ্রহ নিজস্ব রকেটের সাহায্যে মহাকাশে পাঠাতে পারবে, ততই কমবে বিদেশি উৎক্ষেপণ পরিষেবার উপর নির্ভরতা। সেই অর্থে GSLV শুধু একটি রকেট নয়, ভারতের নিজস্ব মহাকাশ সক্ষমতার অন্যতম স্তম্ভ।
এক সময় যার নামের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল ব্যর্থতার গল্প, সেই ‘নটি বয়’-এর এবারের উড়ান তাই অন্য বার্তা দিল। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রযুক্তিকে আরও নির্ভরযোগ্য করার বার্তা। আর শ্রীহরিকোটা থেকে আকাশে উঠে যাওয়া GSLV-F17 যেন বলল—দুষ্টুমি অনেক হয়েছে, এ বার দায়িত্ব সামলানোর পালা।