কলকাতা: এক দিন হয়তো সমুদ্রের জল এসে থামবে শহরের দোরগোড়ায়। রাস্তা, বাড়ি, বাজার, বন্দর—সব পেরিয়ে জল ঢুকবে শহরের ভিতরে। হারিয়ে যাবে চেনা ভূগোল। প্রশ্নটা এত দিন ছিল, কবে হবে? রাষ্ট্রপুঞ্জের নতুন রিপোর্ট বলছে, সেই প্রশ্ন করার সময়ও ফুরিয়ে আসছে। সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। তা ইতিমধ্যেই ‘তাৎক্ষণিক ঝুঁকি’। আর সেই বিপদের তালিকায় রয়েছে কলকাতা, মুম্বইয়ের মতো ভারতীয় শহরও।
শুধু জল বাড়ছে না। বাড়ছে তার গতি। রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাবে, ২০১৪ থেকে ২০২৩—এই দশ বছরে বিশ্ব জুড়ে সমুদ্রের জলস্তর বছরে গড়ে ৪.৭ মিলিমিটার করে বেড়েছে। ২০২৪ সালে সেই হার এক লাফে পৌঁছেছে ৫.৯ মিলিমিটারে—রেকর্ড। রাষ্ট্রপুঞ্জের ভাষায়, সমুদ্রের জল এখন মানবসভ্যতার ইতিহাসে নজিরবিহীন দ্রুততায় বাড়ছে।
আর সবচেয়ে বড় ভয় দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপ অঞ্চল নিয়ে। রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘Challenges related to sea level rise and ways and approaches to address it’ রিপোর্টে বলা হয়েছে, কলকাতা, মুম্বই এবং ঢাকার মতো শহর-সহ দক্ষিণ এশিয়ার নিম্ন বদ্বীপ অঞ্চলে ১ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষ স্থায়ী জলমগ্নতার কারণে ঘর হারানোর ‘তাৎক্ষণিক’ ঝুঁকিতে। এখানে বিপদের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি কোটি কোটি টাকার পরিকাঠামো নয়—মানুষ। তাঁদের ঘর। তাঁদের জীবন। তাঁদের ভবিষ্যৎ।
অর্থাৎ, কলকাতার বিপদ শুধু গঙ্গা বা বর্ষার জল জমে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শহরের চারপাশের বদ্বীপভূমি, নদী, খাল, নিকাশি ব্যবস্থা এবং ভূগর্ভস্থ জলের উপর একসঙ্গে চাপ বাড়ছে। সমুদ্রের জল যত ভিতরে ঢুকবে, ততই বাড়বে জলমগ্নতা ও নোনা জলের সমস্যা। তার সঙ্গে কোথাও যদি জমিও ধীরে ধীরে বসতে থাকে, বিপদের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়নে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহ ও বরফস্তর গলছে। উষ্ণ হচ্ছে সমুদ্রও। সমুদ্রের জল উষ্ণ হলে তার আয়তন বাড়ে। বরফ গলে বাড়ে সমুদ্রে জলের পরিমাণ। দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবেই সমুদ্রপৃষ্ঠ ক্রমশ উঁচু হচ্ছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ জানিয়েছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এবং অস্বাভাবিক সমুদ্র উষ্ণায়নই এই ত্বরান্বিত বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।
তার অভিঘাতও বহুমুখী। সমুদ্রের নোনা জল স্থলভাগের দিকে ঢুকে পড়লে মাটি হয়ে উঠতে পারে আরও লবণাক্ত। কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভূগর্ভস্থ মিষ্টি জলে ঢুকে পড়তে পারে নোনা জল। ফলে পানীয় জলের নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে। নিকাশি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাড়বে জলাবদ্ধতা এবং জলবাহিত রোগের আশঙ্কা। বিপন্ন হবে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র, মাছধরা-সহ বহু মানুষের জীবন-জীবিকা।
শুধু কলকাতা নয়। মুম্বইও রয়েছে সেই সতর্কবার্তার কেন্দ্রে। তবে বিশ্বের সব শহরের বিপদ এক রকম নয়। মিয়ামি, নিউ ইয়র্ক বা চিনের গুয়াংঝাউয়ের মতো ধনী শহরে সমুদ্র বাড়ার সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিপুল আর্থিক সম্পদ ও পরিকাঠামো রক্ষা করা। দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপে প্রশ্নটা আরও নির্মম—মানুষ যাবে কোথায়?
রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাব বলছে, পৃথিবীর প্রায় ৭৭ কোটি মানুষ ইতিমধ্যেই এমন উপকূলীয় এলাকায় বাস করেন, যা উচ্চ জোয়ারের রেখার পাঁচ মিটারের মধ্যে। সমুদ্রস্তর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই মানুষগুলির উপর বন্যা, ক্ষয়, লবণাক্ততা ও বাস্তুচ্যুতির চাপ বাড়বে।
তবে এই সতর্কবার্তার অর্থ এই নয় যে কলকাতা আগামীকালই জলের তলায় চলে যাবে। বরং রাষ্ট্রপুঞ্জের বার্তা আরও গভীর—সমুদ্রস্তর বৃদ্ধি শুরু হয়ে গিয়েছে, তার গতি বাড়ছে, তাই প্রস্তুতির সময় এখনই। উপকূল রক্ষা, নিকাশি ও জলব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা বাঁচানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা জরুরি।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ের গল্প নতুন নয়। কিন্তু এই লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ কোনও বাঁধ ভাঙা নদী নয়, কোনও এক দিনের বন্যাও নয়। প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে উঠে আসা সমুদ্র। আজ হয়তো কলকাতার রাস্তায় জল নামছে। কাল তা নেমেও যাবে। ট্রেন চলবে, বাস চলবে, শহরও তার চেনা ছন্দে ফিরবে। কিন্তু সমুদ্রের জল এক বার যে দিকে এগোয়, তাকে আগের জায়গায় ফেরানো সহজ নয়।
তাই প্রশ্নটা আর, ‘কখন কলকাতা ডুববে?’ নয়। প্রশ্নটা হল, সমুদ্রের জলস্তর যখন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কলকাতা কি তার আগেই নিজেকে বাঁচানোর মতো প্রস্তুত হবে? সময়েই মিলবে সদুত্তর৷