বেঙ্গালুরু: চোখের সামনে শুধু নীল জল। ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। এক বালতি সমুদ্রের জল হাতে নিলে তার মধ্যে ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব টের পাওয়ার উপায় নেই। অথচ বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে, সেই বিশাল নোনা জলের ভাণ্ডারে মিশে রয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টন ইউরেনিয়াম। পরমাণু বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ জ্বালানির সম্ভাব্য ভাণ্ডার যেন ছড়িয়ে রয়েছে সমুদ্রের বুকেই। কিন্তু সেই ইউরেনিয়ামকে অন্য অসংখ্য আয়নের ভিড় থেকে আলাদা করে বার করাই ছিল বড় সমস্যা। এ বার সেই সমস্যার সমাধানের দিকে গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ এগোল বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (IISc)।
IISc-এর বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন বিশেষ ধরনের একটি মেমব্রেন, যা অনেকটা অতি সূক্ষ্ম ‘ছাঁকনি’র মতো কাজ করে। তবে এই ছাঁকনি চোখে দেখা সাধারণ ফিল্টারের মতো নয়। ন্যানোমিটার মাপের স্তরের বিশেষ বিন্যাস ব্যবহার করে এটি ইউরেনিয়াম-যুক্ত ইউরেনিল আয়নকে আটকে রাখতে পারে, অথচ সমুদ্রের জলে থাকা অন্যান্য সাধারণ আয়নকে অপেক্ষাকৃত সহজে পার হয়ে যেতে দেয়।
সমুদ্রেই এত ইউরেনিয়াম কেন?
স্থলভাগে ইউরেনিয়ামের মজুত সীমিত। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর স্থলভাগে প্রায় ৭৫ লক্ষ টন ইউরেনিয়াম রয়েছে। কিন্তু সমুদ্রের জল যেন সম্পূর্ণ অন্য এক ভাণ্ডার। সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টন ইউরেনিয়াম।
সংখ্যার এই বিপুল ফারাকই বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ দিন ধরে সমুদ্রের দিকে তাকাতে বাধ্য করেছে। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউরেনিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। স্থলভাগের সহজলভ্য ইউরেনিয়ামের মজুত এক দিন কমে আসতে পারে। তখন সমুদ্রের জল থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহের প্রযুক্তি কার্যকর হয়ে উঠলে জ্বালানির একটি কার্যত বিশাল নতুন উৎস খুলে যেতে পারে।
কিন্তু সমস্যাটা সেখানেই। সমুদ্রের জলে ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব অত্যন্ত কম। তার সঙ্গে রয়েছে সোডিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম-সহ অসংখ্য ধরনের আয়ন। যেন কোটি কোটি মানুষের ভিড়ের মধ্যে নির্দিষ্ট একজনকে খুঁজে বার করা। ইউরেনিয়ামকে চিহ্নিত করে আলাদা করার সময় অন্য আয়নগুলিকে বাদ দেওয়া তাই অত্যন্ত কঠিন।
রাসায়নিক ‘টোপ’ নয়, এবার কাজে লাগল গঠন
এই জায়গাতেই IISc-এর গবেষণার অভিনবত্ব। বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন স্লিপড কোভ্যালেন্ট অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক (COF) মেমব্রেন। এটি এমন একটি স্তরবদ্ধ ন্যানো-গঠন, যার ভিতরের রাস্তা ও ফাঁকফোকরকে অত্যন্ত নির্দিষ্ট ভাবে সাজানো যায়।
আগের অনেক গবেষণায় ইউরেনিয়াম আয়নকে আটকে রাখতে বিশেষ রাসায়নিক ফাংশনাল গ্রুপ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ মেমব্রেনের গায়ে এমন রাসায়নিক ‘টোপ’ লাগানো হত, যার সঙ্গে ইউরেনিয়াম যুক্ত হবে। কিন্তু IISc-এর বিজ্ঞানীরা অন্য পথ নিয়েছেন।
তাঁরা COF-এর স্তরগুলিকে সামান্য ‘স্লিপ’ বা সরিয়ে এমন এক ন্যানোস্কেল গঠন তৈরি করেছেন, যা বিভিন্ন আয়নের চলাচলের ক্ষেত্রে আলাদা বাধা তৈরি করে। ফলে ইউরেনিল আয়নের পথ এক রকম, অন্য আয়নের পথ আর এক রকম। সহজ ভাষায়, মেমব্রেনটি শুধু ইউরেনিয়ামকে ‘ধরছে’ না—বরং তার গঠন দিয়েই ঠিক করে দিচ্ছে কে কোন পথে যাবে।
কী ভাবে কাজ করছে এই অতি সূক্ষ্ম ছাঁকনি?
গবেষকেরা মেমব্রেনের ভিতর দিয়ে বিভিন্ন আয়নের চলাচল বিশ্লেষণ করেছেন। বিশেষ করে তাঁরা দেখেছেন আয়নের চারপাশে জলের অণুগুলির বিন্যাস বা হাইড্রেশন স্ট্রাকচার, মেমব্রেন পেরোনোর সময় প্রয়োজনীয় শক্তির বাধা বা ফ্রি-এনার্জি ব্যারিয়ার এবং মেমব্রেনের সঙ্গে আয়নের ঘর্ষণ।
এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখেই বোঝা যায়, কোন আয়ন মেমব্রেনের স্তরের মধ্যে দিয়ে কতটা সহজে চলাচল করতে পারবে। COF-এর স্তরগুলির বিশেষ বিন্যাস সেই চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে সাধারণ আয়নগুলি মেমব্রেন অতিক্রম করলেও ইউরেনিল আয়নকে আটকে রাখা সম্ভব হয়।
শুধু পরমাণু জ্বালানি নয়, লক্ষ্য দূষিত ভূগর্ভস্থ জলও
গবেষণাটির সম্ভাবনা শুধু সমুদ্রের জল থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহে সীমাবদ্ধ নয়। ভূগর্ভস্থ জলে ইউরেনিয়ামের উপস্থিতিও অনেক জায়গায় পরিবেশগত উদ্বেগের কারণ। সেই জল থেকে ইউরেনিয়াম আলাদা করার ক্ষেত্রেও এই ধরনের মেমব্রেন ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে।
অর্থাৎ একই প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রয়োগের দু’টি দিক—এক দিকে সমুদ্রের জল থেকে মূল্যবান ইউরেনিয়াম সংগ্রহ, অন্য দিকে ইউরেনিয়াম-দূষিত জল পরিশোধন। গবেষণাটি করেছেন IISc-এর পদার্থবিদ্যা বিভাগের যোগেন্দ্র কুমার ও বীনু ভার্ঘিসি, প্রাবল কে. মাইতির নেতৃত্বে। বেঙ্গালুরুর Accenture Labs-এর সঙ্গেও যৌথ ভাবে গবেষণাটি করা হয়েছে।
সমুদ্রের জল কি তবে ভবিষ্যতের ‘ইউরেনিয়াম খনি’?
এখনই অবশ্য এমন দাবি করার সময় আসেনি। সমুদ্রের জল থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল—এই প্রক্রিয়াকে বৃহৎ পরিসরে কতটা কার্যকর এবং অর্থনৈতিক করা যাবে। গবেষণাগারে কোনও প্রযুক্তি কাজ করা এবং কোটি কোটি টন সমুদ্রের জল প্রক্রিয়াজাত করে বাণিজ্যিক ভাবে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করা এক নয়।
তবু IISc-এর গবেষণার গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, কোনও নির্দিষ্ট আয়নকে আলাদা করার জন্য সব সময় তার সঙ্গে রাসায়নিক ভাবে ‘বন্ধুত্ব’ করানোর প্রয়োজন নেই। মেমব্রেনের ন্যানোস্কেল স্থাপত্যকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আজ সমুদ্রের জলে মিশে থাকা ইউরেনিয়াম। কাল হয়তো অন্য কোনও মূল্যবান আয়ন, দূষক বা শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান। স্তরের সামান্য বিন্যাস বদলে যদি আয়নের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে জল পরিশোধন এবং পদার্থ পৃথকীকরণের প্রযুক্তিতে খুলে যেতে পারে নতুন দরজা।
সমুদ্রের ঢেউ তাই আপাতত শুধু ঢেউই। কিন্তু সেই নোনা জলের অদৃশ্য ভাণ্ডারে যে বিপুল ইউরেনিয়াম লুকিয়ে রয়েছে, তাকে কাজে লাগানোর দৌড়ে IISc-এর এই গবেষণা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সমুদ্রকে ‘খনি’ বানানোর স্বপ্ন এখনও দূর, কিন্তু সেই স্বপ্নের ছাঁকনি তৈরির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে।