নিউ ইয়র্ক: এক হাতে প্রযুক্তির দুনিয়া, অন্য হাতে মেহেন্দির কোণ। সপ্তাহের কর্মদিবসে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আর অবসরে পেশাদার মেহেন্দি শিল্পী। আমেরিকার মাটিতে দুই পেশাকে পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে নজর কেড়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রিয়াঙ্কা জৈন। তাঁর মেহেন্দির কাজ থেকে আয়ের কথা প্রকাশ্যে আসতেই সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর ভিডিয়ো প্রায় এক কোটি বার দেখা হয়েছে।
প্রিয়াঙ্কা জানিয়েছেন, আমেরিকায় তিনি পূর্ণ সময় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করেন। সেই চাকরিই তাঁর মাসিক খরচ সামলায়। কিন্তু ছোটবেলার সৃজনশীলতার টান থেকে মেহেন্দির কাজও ছাড়েননি। বরং সেটিকে পরিণত করেছেন নিয়মিত পার্ট-টাইম পেশায়।
আর সেখানেই চমক। তাঁর দাবি, মেহেন্দি আঁকার জন্য তিনি ঘণ্টায় প্রায় ১০০ ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় আনুমানিক ৯-১০ হাজার টাকা নেন। তার উপর অনেক গ্রাহকই মূল পারিশ্রমিকের সঙ্গে অতিরিক্ত ‘টিপ’ দেন। সেই টাকার পরিমাণ কখনও কখনও ঘণ্টাপিছু পারিশ্রমিকের আরও ২০ শতাংশ পর্যন্ত হয়।
তবে আসল আয় হয় বিয়ের অনুষ্ঠানে। প্রিয়াঙ্কার কথায়, একটি পূর্ণাঙ্গ ব্রাইডাল বুকিংয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। সেই এক দিনের কাজ থেকেই তাঁর আয় পৌঁছে যেতে পারে প্রায় ১ লক্ষ টাকা বা ১২০০ ডলারের বেশি। অর্থাৎ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাকরির বাইরে নিজের একটি দক্ষতাকেও তিনি তৈরি করেছেন আলাদা আয়ের উৎস হিসাবে।
এই গল্পের আর একটি দিকই সমাজমাধ্যমে বেশি আলোড়ন তুলেছে। প্রিয়াঙ্কার বক্তব্য, ভারতে মেহেন্দি শিল্পীকে অনেক সময় পেশা হিসাবে যথেষ্ট মর্যাদা দেওয়া হয় না। কিন্তু আমেরিকায় তিনি নিজেকে ‘শিল্পী’ হিসাবেই পরিচয় দিতে পারেন। তাঁর কথায়, সেখানে কোনও কাজকে ছোট বা বড় করে দেখার প্রবণতা তুলনামূলক ভাবে কম।
হিন্দিতে দেওয়া ভিডিয়োতে তিনি বলেন, আমেরিকায় আসার পর তাঁর মনে হয়েছে, শিল্পীদের এখানে যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হয়। মেহেন্দি আঁকার কাজ করেও তাঁর কখনও মনে হয় না যে তিনি ‘ছোট’ কোনও কাজ করছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—কাজ মানেই কাজ, তার ছোট-বড় বলে কিছু নেই।
প্রিয়াঙ্কার এই বক্তব্যই সম্ভবত ভিডিয়োটিকে এত দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় এক কোটি দর্শক ভিডিয়োটি দেখার পরে সমাজমাধ্যমে নানা মত উঠে এসেছে। কেউ বলেছেন, শিল্পীদের প্রতি এই সম্মানই বিদেশের কর্মসংস্কৃতির বড় দিক। কেউ আবার মজা করে লিখেছেন, ‘‘এমন কাজ আগে করলে এত দিনে কোটিপতি হয়ে যেতাম!’’
কেউ কেউ আবার ভারতের সামাজিক মানসিকতার দিকটিও তুলে ধরেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এখনও বহু পরিবারে সরকারি চাকরিকে ‘নিরাপদ’ ও ‘সম্মানজনক’ পেশা হিসাবে দেখা হয়, অথচ দক্ষতা-নির্ভর বহু কাজকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
তবে প্রিয়াঙ্কা নিজেও একটি বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আমেরিকায় মেহেন্দি এঁকে ঘণ্টায় হাজার হাজার টাকা আয় করা সম্ভব হলেও সেখানে জীবনযাত্রার খরচও যথেষ্ট বেশি। ফলে ভারতীয় টাকায় পারিশ্রমিকের অঙ্ক দেখেই আমেরিকার আয়-ব্যয়ের পুরো ছবি বোঝা যাবে না।
তবু প্রিয়াঙ্কার গল্পটি অন্য কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো তথাকথিত ‘সাদা কলার’ পেশার পাশাপাশি নিজের সৃজনশীল দক্ষতাকে তিনি আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন। অর্থাৎ একটি চাকরির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে নিজের প্রতিভাকেও কাজে লাগিয়েছেন।
দিনে কোডিং, রাতে মেহেন্দির নকশা! এক পেশার পরিচয়ে নিজেকে আটকে না রেখে নিজের দক্ষতার একাধিক দরজা খুলে রাখার এই গল্পই এখন সমাজমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে।