হাবিবুর রহমান, ঢাকা : চীনা বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে মোংলা বন্দরকে একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় বন্দরে রূপান্তর করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। ফলে শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নয়, দেশের সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশে খুলনা, যশোর, বরিশালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প ও কৃষিপণ্য দ্রুত পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনাও বাড়বে।
সম্প্রতি দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও চুক্তির মাধ্যমে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ৩৩৫ মিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি ও বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় দুটি নতুন কন্টেইনার জেটি, একটি লোডেড কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং একটি খালি কন্টেইনার ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং দ্রুত করতে ৪টি গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৭টি রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ মোট ৩৩টি আধুনিক জেটি সরঞ্জাম যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে বার্ষিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৩,৯৪,০০০ টিইইউএস বৃদ্ধি পাবে।
মোংলা বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে তৈরি হচ্ছে চীন-বাংলাদেশ মোংলা পোর্ট ইকোনমিক জোন। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং চীন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন (সিসিইসিসি)-এর মধ্যে এই বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এই জোনে প্রায় ৩০টি চীনা প্রতিষ্ঠান ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছে। চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, মোংলা ইপিজেড এবং বন্দরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্থানীয় প্রায় ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস এবং হসপিটালিটি খাতে নতুন নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সূত্রমতে, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ মোংলা উপকূলীয় অঞ্চলের বেকারত্ব দূরীকরণে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসি-এর মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় বাগেরহাটের মোংলা বন্দর সংলগ্ন ১১০ একর জমির ওপর এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটির কাজ দুটি ধাপে সম্পন্ন হবে, যা সামগ্রিকভাবে প্রায় ৬০,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এর মধ্যে প্রথম ধাপেই প্রায় ২৫,০০০ মানুষের চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া মোংলা বন্দরের কর্মযজ্ঞ ও আমদানি-রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বন্দরকেন্দ্রিক লজিস্টিকস, সিঅ্যান্ডএফ এবং পরিবহন খাতে স্থানীয়দের জন্য প্রচুর কাজের সুযোগ তৈরি হবে। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের ফলে স্থানীয় যুবকদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের যোগ্যতা বাড়াবে। এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে মোংলা নদীতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু এবং ২৩ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইনের মতো বড় বড় অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে।
গত ১৬ আগস্ট প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন জ্বালানি মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা, নৌপরিবহন, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং বিডার চেয়ারম্যান। পরিদর্শনকালে নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, আগামী অক্টোবর থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চলটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনা বিনিয়োগের অর্থ শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হওয়া নয়; অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ বাংলাদেশ এখন এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর এই চারটি বিষয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনা বিনিয়োগ এলে মোংলা তিনটি বড় সুবিধা পেতে পারে; প্রথমত, নতুন শিল্প; দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনশক্তি; তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা জ্ঞান।
খুলনা ৫ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজগর লবি জাজবাত২৪ বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের, রপ্তানিমুখী, শিল্পায়িত ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করাই সরকারের লক্ষ্য। তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান। চীন টানা ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭০০টি চীনা অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত রয়েছে। দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে এবং আরও বেশি চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সিসিপিআইটি কাজ করে যাবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোংলা বন্দরে অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনে চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তি দেশের বিনিয়োগ নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, বাংলাদেশ এখন বড় পরিসরে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্ব দিচ্ছে। মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে চীনের আরও বিনিয়োগ আসতে পারে, যা উপকূলীয় এলাকায় কর্মসংস্থান বাড়াতে এবং বেকারত্ব কমাতে সহায়ক হবে। এ জন্য স্থানীয়দের দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন।
চীনকে দেওয়া এই ১১০ একর জমি ২০১৫ সালে শুরু হওয়া দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের অধীনে প্রথমে ভারতের অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু ভারত সরকারের মনোনীত ডেভেলপার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু করতে পারেনি। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। বেজার কর্মকর্তারা জানান, চুক্তিতে নির্ধারিত দুই বছরের মধ্যেও ভারতীয় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি ভূমি উন্নয়নের মূল কাজ শুরু করতে ব্যর্থ হয়। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকল্পটি তালিকা থেকে বাদ দেয় বা বাতিল করে।