হাবিবুর রহমান, ঢাকা : বাংলাদেশে দীর্ঘ ৬৫ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে উপকূলের জেলেরা বুকভরা আশা নিয়ে সাগরে ও নদীতে জাল ফেললেও বৈরী আবহাওয়া, নদ-নদীর নাব্যতা সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মাছের অভিবাসন পথ বদলে যাওয়ায় উপকূলীয় এলাকায় ইলিশের চরম আকাল দেখা দিয়েছে।
বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় ঘন ঘন লঘুচাপ এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা ঠিকমতো ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতে পারছেন না। এর ওপর বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকায় তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে বরফকলগুলো সচল রাখা যাচ্ছে না, যার ফলে ধরা পড়া সীমিত মাছও সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উপকূলের আন্ধারমানিক ও রামনাবাদ চ্যানেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোতে চর জেগে ওঠায় সমুদ্র থেকে ইলিশের মিঠা জলে আসার স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে গভীর সমুদ্রের জেলেরা কিছু ইলিশ পেলেও উপকূল ও নদীর সাধারণ জেলেরা খালি হাতে ফিরছেন। ধার-দেনা, চড়া সুদে দাদন এবং চড়া মূল্যের জ্বালানি কিনে জেলেরা সাগরে গেলেও তেলের খরচই উঠছে না। ফলে পরিবার চালানো ও ঋণের কিস্তি শোধ করা উপকূলের মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর জন্য এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
টানা তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের দুয়ার খুললেও উপকূলীয় বনজীবীদের মুখে স্বস্তির হাসি নেই। সুন্দরবনে যেতে অনীহা তাদের। তবে পর্যটকদের আনাগোনায় প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ থাকার পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন উন্মুক্ত করা হয়।
তবে বনজীবীরা জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জীবিকার তাগিদে বনে ফেরার এই আনন্দে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, সৃষ্ট লঘুচাপ, মরা কাটাল ও বেপরোয়া জলদস্যু বাহিনী। সুন্দরবনে প্রবেশের পূর্বশর্ত হিসেবে জেলেদের দিতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের চাঁদা, দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকায় যা তাদের পক্ষে ম্যানেজ করা সম্ভব হচ্ছে না। আর এটি নিয়ে পুরো উপকূলজুড়ে বনজীবীরা চরম উদ্বেগ ও হতাশায় দিন পার করছেন।
কয়রার কাশেম জেলে জাজবাত২৪ বাংলাকে জানান, এখন মাছ ধরতে না পারলে সংসার চলবে না, তাই নদীতে আসছি। কয়ডা মাছ পাইনি কি না, বনে যাইনি মরা কাটাল চলছে। সামনের রবিবারে গোনের জোয়ারে বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। শনিবার পাস নেব। তিনি আরও বলেন, তিন মাস কোনো আয়ের পথ ছিল না। এবার মাছ-কাঁকড়া ধরার মাধ্যমে দোকানদারের কাছে ধার শোধ করার পরিকল্পনা আছে। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই আমরা বনাঞ্চলে প্রবেশ করতে অনুমতি নিয়েছি। বনদস্যুর চাঁদা ম্যানেজ করতে কিছু টাকা ঘাটতি আছে ও মরা গোন থাকায় এখনো সুন্দরবনে যেতে পারিনি। শনি-রবিবার আল্লাহ ভালো করলে বনে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জেলে অনুমতি নিতে সরকারি রাজস্বের বাইরে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করে বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ও কেউ কেউ বন বিভাগের নজর এড়িয়ে এবং কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে সুন্দরবনে ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ ধরেছেন। এ ছাড়া সারা বছর অভয়ারণ্যগুলোতে মাছ ধরা নিষেধ থাকলেও অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মাছ ধরে থাকেন বিষ দিয়ে। এতে মাছ ও কাঁকড়ার সংখ্যা কমে গেছে বলে তাদের আশঙ্কা। একই সঙ্গে দস্যুদের চাঁদার ভয়ও বনে যাওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন জাজবাত২৪ বাংলাকে জানান, তাদের স্টেশনে ৮৮৪টি নৌযানের বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। আজ বেলা ১২টা পর্যন্ত ৩৪২ জন জেলে অনুমতিপত্র নিয়েছেন। কয়েক দিন বৃষ্টি হচ্ছে। অনুমতি পাওয়ার দিন থেকে নদীতে মরা কাটাল চলছে, এই জন্য অনেকে অনুমতি নেয়নি। অনেকেই নিলেও প্রস্তুতি নিচ্ছেন সামনে গোনে সুন্দরবনে যাবেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে রেজিস্টার্ড বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) রয়েছে ২ হাজার ৭১৭টি। আজ পর্যন্ত অনুমতি নিয়েছেন ৬৮০ জন। সাতক্ষীরা রেঞ্জে রেজিস্টার্ড বিএলসি রয়েছে ২ হাজার ৯০০টি। আজ পর্যন্ত অনুমতি নিয়েছেন ৭৯০ জন। প্রতি নৌকায় দুই থেকে তিনজন করে প্রায় জেলেরা ধাপে ধাপে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-নালায় প্রবেশ করেন।
তবে তিন মাস পর সুন্দরবন খুলে দেওয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। সুন্দরবন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (টিওএএস) সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনটির অধীনে বর্তমানে ৭৫টি নৌযান রয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মো. মঈনুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার জাজবাত২৪ বাংলাকে বলেন, প্রথম দিন থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত খুলনা থেকে ১০টি লঞ্চ ৩১০ জন পর্যটক নিয়ে সুন্দরবনের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। আবহাওয়া ভালো হলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে।