কলকাতা মেট্রোর ইতিহাসে শুরু হতে চলেছে নতুন অধ্যায়। দিল্লি ও মুম্বইয়ের পর এবার কলকাতাতেও চালু হতে চলেছে চালকবিহীন মেট্রো পরিষেবা। ইস্ট-ওয়েস্ট করিডর বা গ্রিন লাইনে হাওড়া ময়দান থেকে সল্টলেক সেক্টর ফাইভ পর্যন্ত এই অত্যাধুনিক পরিষেবা চালুর প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি সফল ট্রায়াল রান এবং কমিশনার অফ রেলওয়ে সেফটির (CRS) ছাড়পত্র পাওয়ার পর পরিষেবা চালুর পথে বড় পদক্ষেপ নিল মেট্রো কর্তৃপক্ষ।
প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্রিন লাইনে মোট ১২টি স্টেশন রয়েছে। এই রুটেই প্রথমবারের মতো চালকবিহীন প্রযুক্তিতে মেট্রো চলবে। গত ১২ জুলাই সফলভাবে এই পরিষেবার ট্রায়াল রান সম্পন্ন হয়েছে। ট্রায়ালের পর নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে কমিশনার অফ রেলওয়ে সেফটি অনুমোদন দিয়েছে।
কলকাতা মেট্রোর মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক (CPRO) এস. এস. কান্নান জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ পরিষেবা অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। তিনি বলেন, “ট্রেনে ক্রু থাকবেন, তবে অপারেশন সম্পূর্ণ অটোমেটিক হবে। নির্ধারিত সময়সূচি বজায় থাকবে, ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষের কোনও আশঙ্কা থাকবে না এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পুরো পরিষেবা সল্টলেকের অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার (OCC) থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।”
এই পরিষেবা পরিচালনার জন্য গ্রিন লাইনে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক কমিউনিকেশন-বেসড ট্রেন কন্ট্রোল (CBTC) সিগন্যালিং ব্যবস্থা। এই প্রযুক্তিতে প্রতিটি মেট্রো রেডিও-ভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে ট্রেনের গতি, অবস্থান এবং দূরত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলাচল আরও নির্ভুল হবে এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
বর্তমানে গ্রিন লাইনে ৭ থেকে ৮ মিনিট অন্তর মেট্রো চলাচল করে। তবে CBTC প্রযুক্তি চালু হলে সেই ব্যবধান কমে মাত্র ৩ মিনিটে নেমে আসবে বলে দাবি মেট্রো কর্তৃপক্ষের। এর ফলে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমবে, পরিষেবা আরও ঘন ঘন মিলবে এবং যাত্রী পরিবহণের ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
যদিও এই পরিষেবাকে ‘চালকবিহীন’ বলা হচ্ছে, তবুও নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেনে একজন প্রশিক্ষিত কর্মী উপস্থিত থাকবেন। তিনি সিগন্যাল ও টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের সদস্য হবেন। তাঁর দায়িত্ব থাকবে ট্রেন চালুর প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, প্রয়োজনে ট্রেন চালু বা বন্ধ করা, দরজা খোলা-বন্ধ করা এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর (PSD) নিয়ন্ত্রণ করা। তবে ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ, স্টেশনভিত্তিক চলাচল এবং সামগ্রিক অপারেশন সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
এই গোটা পরিষেবা নিয়ন্ত্রণ করা হবে সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কে অবস্থিত মেট্রো অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার থেকে। সেখান থেকেই রিয়েল-টাইমে ট্রেন চলাচল পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কম সময়ের ব্যবধানে ট্রেন চলাচলের ফলে যাত্রীদের যাতায়াতে যেমন গতি আসবে, তেমনি শহরের গণপরিবহণ ব্যবস্থায়ও যুক্ত হবে নতুন মাত্রা।