কলকাতা: ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলির একটি হল প্রশাসন ও সংগঠনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষেত্রেও সেই বাস্তব ছবিই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। একদিকে নির্বাচিত বিধায়ক এবং তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি, অন্যদিকে বহু বছর ধরে সংগঠন গড়ে তোলা জেলা, মণ্ডল ও বুথ স্তরের পদাধিকারীরা। এলাকায় কর্তৃত্ব কার? সিদ্ধান্ত নেবেন কে? এই প্রশ্ন ঘিরেই দলের অন্দরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রকাশ্যে কেউ মুখ না খুললেও, বিভিন্ন জেলায় এই টানাপোড়েন এখন বিজেপির অন্যতম আলোচ্য বিষয়।
দলীয় সূত্রের দাবি, বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামো বরাবরই অত্যন্ত সুসংহত। বুথ থেকে রাজ্য— প্রতিটি স্তরেই দায়িত্ব নির্দিষ্ট। দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতি করার সময় এই সাংগঠনিক কাঠামোর উপরই ভর করে দল নিজেদের বিস্তার ঘটিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন বিধায়কদের উপর রয়েছে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধান এবং উন্নয়নমূলক কাজের দায়িত্ব। সেই কাজের সুবিধার জন্য প্রায় প্রতিটি বিধায়কই এলাকায় প্রতিনিধি নিয়োগ করেছেন।
সেখানেই তৈরি হচ্ছে জটিলতা। অনেক সাংগঠনিক পদাধিকারীর অভিযোগ, প্রশাসনিক কাজের সীমা ছাড়িয়ে কিছু বিধায়ক প্রতিনিধি দলীয় বৈঠক, কর্মসূচি, কর্মী বাছাই, এমনকি সাংগঠনিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তার করছেন। ফলে বহু দিনের সংগঠকরা নিজেদের গুরুত্ব হারানোর আশঙ্কা করছেন। তাঁদের বক্তব্য, দলের সংবিধান অনুযায়ী সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নির্বাচিত পদাধিকারীদের। বিধায়ক প্রতিনিধি দলের কোনও সাংবিধানিক পদ নয়। ফলে প্রশাসনিক কাজের বাইরে তাঁদের ভূমিকা সীমিত থাকা উচিত।
অন্যদিকে বিধায়ক শিবিরের যুক্তি ভিন্ন। তাঁদের বক্তব্য, মানুষ ভোট দিয়ে একজন বিধায়ককে নির্বাচিত করেন। স্বাভাবিকভাবেই এলাকার উন্নয়ন, সরকারি প্রকল্পের অগ্রগতি, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং জনসংযোগের ক্ষেত্রে বিধায়ক ও তাঁর প্রতিনিধির ভূমিকাই মুখ্য। প্রতিটি ছোট সিদ্ধান্তে যদি সাংগঠনিক স্তরে অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয়, তবে প্রশাসনিক কাজের গতি কমে যাবে। অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষও সরাসরি বিধায়কের প্রতিনিধির কাছেই সমস্যার সমাধান চাইছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত নতুন নয়। যে কোনও দল বিরোধী শিবির থেকে ক্ষমতায় এলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। কারণ, বিরোধী অবস্থায় সংগঠনই দলের মূল শক্তি। কিন্তু ক্ষমতায় এলে প্রশাসনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক সংগঠন— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। সেই পরীক্ষার মুখোমুখি এখন বিজেপি।
দলীয় অন্দরে আলোচনা শুরু হয়েছে, খুব শীঘ্রই বিধায়ক প্রতিনিধি এবং সাংগঠনিক পদাধিকারীদের দায়িত্বের সীমারেখা স্পষ্ট করতে নির্দেশিকা জারি হতে পারে। কে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন, কোথায় বিধায়কের ভূমিকা এবং কোথায় সংগঠনের কর্তৃত্ব— তা লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হতে পারে। তাতে ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি ও দ্বন্দ্ব অনেকটাই কমবে বলে মনে করছে নেতৃত্বের একাংশ।
তবে এই বিতর্কের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। কারণ, আগামী দিনে পঞ্চায়েত থেকে পুরসভা— সব নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হবে সংগঠনকে কেন্দ্র করেই। সেখানে যদি জনপ্রতিনিধি ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়, তার প্রভাব ভোটের রাজনীতিতেও পড়তে পারে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিজেপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল সরকার পরিচালনা নয়, বরং ক্ষমতার দুই স্তম্ভ— প্রশাসন ও সংগঠন—কে একই ছাতার নিচে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কারণ, সংগঠন দুর্বল হলে প্রশাসনের শক্তিও দীর্ঘস্থায়ী হয় না, আবার জনপ্রতিনিধিকে অকার্যকর করে রাখলেও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বিজেপি নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলির একটি।