কলকাতা: কেউ তাঁকে দেখে বুঝতেই পারবেন না, তিনি একটি নামী প্রযুক্তি সংস্থার কর্মী। সাধারণ পোশাক, পায়ে বহুবার সেলাই করা একটি পুরনো জুতো। নতুন জুতো কেনার সামর্থ্য হয়তো তাঁর আছে। কিন্তু তিনি কেনেন না। কারণ, সেই টাকা তাঁর নিজের জন্য নয়। সেই টাকা জমে বাবা-মায়ের ঋণ শোধের তহবিলে। সেই টাকা যায় ছোট ভাইবোনের পড়াশোনার খরচে।
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই নিজের স্বপ্নের আগে পরিবারের স্বপ্নকে জায়গা দিয়েছেন এক তরুণী। আর তাঁর এই নীরব আত্মত্যাগের গল্পই সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন জোহোর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীধর ভেম্বু।
একটি পোস্টে ভেম্বু লিখেছেন, সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে কথা হয় সংস্থার এক তরুণ কর্মীর। আলাপচারিতায় তিনি জানতে পারেন, ওই তরুণীর জীবনের সবচেয়ে বড় ইচ্ছা নতুন ফোন, দামি পোশাক বা বিলাসী জীবন নয়। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য— বাবা-মায়ের কাঁধ থেকে ঋণের বোঝা নামানো এবং ভাইবোনদের এমনভাবে পড়াশোনা করানো, যাতে তাঁদের আর কোনও অভাব না থাকে। তাই নিজের সব চাওয়াকে একে একে সরিয়ে রেখেছেন তিনি।
জুতো ছিঁড়ে গেলে নতুন জুতো কেনেন না। স্থানীয় মুচির কাছে নিয়ে গিয়ে বারবার সেলাই করিয়ে আবার সেই জুতোই পরেন। পোশাক পুরনো হয়ে গেলেও নতুন জামা কেনার কথা ভাবেন না। নিজের জন্য খরচ হওয়ার কথা যে প্রতিটি টাকা, তা তিনি তুলে রাখেন পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য।
এই কথাগুলি শুনে স্তব্ধ হয়ে যান ভেম্বু। তিনি লেখেন, ওই তরুণীর বাবা-মায়ের সঙ্গে একদিন দেখা করতে চান। শুধু একটি কথাই বলতে— “আপনারা অসাধারণ একজন মানুষকে বড় করেছেন। আপনাদের গর্ব হওয়া উচিত।”
ভেম্বুর মতে, আজকের প্রজন্মকে নিয়ে সমাজে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, বাস্তবের সঙ্গে তার অনেকটাই ফারাক। নতুন প্রজন্মকে প্রায়ই আত্মকেন্দ্রিক, বিলাসপ্রিয় বা দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে সমালোচনা করা হয়। কিন্তু এই তরুণীর গল্প যেন সেই ধারণাকে এক মুহূর্তে ভেঙে দেয়।
শুধু এই তরুণী নন, ভেম্বু আরও দু'জন তরুণ কর্মীর উদাহরণও তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি তাঁদের বিয়ে হয়েছে। অথচ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান না করে খুব সাধারণভাবে বিয়ে সেরেছেন তাঁরা। অযথা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ না করে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ভেম্বুর মতে, দায়িত্ববোধ, সংযম এবং পারিবারিক মূল্যবোধ কোনও নির্দিষ্ট প্রজন্মের সম্পত্তি নয়।
সমাজমাধ্যমে পোস্টটি প্রকাশের পর অসংখ্য মানুষ আবেগে ভেসেছেন। কেউ লিখেছেন, "একজন মানুষের চরিত্র বোঝার জন্য তাঁর পায়ের জুতোই যথেষ্ট।" আবার কারও মন্তব্য, “এই মেয়েটি আমাদের শেখাল, ভালোবাসা মানে শুধু বড় বড় কথা নয়; প্রিয় মানুষদের জন্য নিজের ইচ্ছাকে নীরবে ত্যাগ করতে পারাও ভালোবাসা।”
কেউ হয়তো অফিসে তাঁর ছেঁড়া জুতোটা দেখেছিলেন। কিন্তু সেই জুতোর প্রতিটি সেলাইয়ের পিছনে যে ছিল একটি পরিবারের স্বপ্ন, একজন বাবার ঋণ, একজন মায়ের নিশ্চিন্ত ঘুম আর কয়েকটি ভাইবোনের ভবিষ্যৎ তা কেউ জানতেন না।
সব নায়কের হাতে আলো থাকে না। কেউ কেউ নীরবে হাঁটেন সেলাই করা পুরনো জুতো পরে। কিন্তু তাঁদের পদচিহ্নই হয়তো সবচেয়ে গভীর হয়ে থেকে যায়!