কলকাতা: নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচেন, এই তথ্য নতুন নয়। কিন্তু সেই দীর্ঘ জীবন কি সুস্থতার সমার্থক? উত্তর বলছে, না। বরং দীর্ঘায়ুর বড় একটা অংশ কাটে অসুখ, যন্ত্রণা ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করেই। চিকিৎসকদের মতে, এটাই মহিলাদের স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে বড় অথচ সবচেয়ে কম আলোচিত বাস্তব।
বিশ্বজুড়ে গড় আয়ুর পরিসংখ্যান বলছে, মহিলারা সাধারণত পুরুষদের চেয়ে কয়েক বছর বেশি বাঁচেন। কিন্তু সেই অতিরিক্ত সময়ের বড় অংশই কাটে স্ট্রোক, অস্টিওপোরোসিস, অ্যালঝাইমার্স, থাইরয়েডের সমস্যা, বাত কিংবা চলাফেরার অক্ষমতার মতো দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ভুগে। অর্থাৎ, জীবন দীর্ঘ হলেও সুস্থ জীবনের সময়টা অনেক ক্ষেত্রেই ছোট হয়ে আসে।
চিকিৎসকদের একাংশের মতে, এর অন্যতম কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের এক বড় সীমাবদ্ধতা। বহু দশক ধরে ওষুধের পরীক্ষা, গবেষণা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কেন্দ্রে ছিল মূলত পুরুষদের শরীর। ফলে মহিলাদের শরীরে একই রোগের উপসর্গ কী ভাবে প্রকাশ পায়, কোন ওষুধের প্রতিক্রিয়া কেমন হয় বা চিকিৎসার ফল কতটা আলাদা হতে পারে— সেই বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব ছিল। এর জের এখনও কাটেনি।
শুধু তাই নয়, একজন মহিলার শরীর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমূল বদলে যায়। বয়ঃসন্ধি, ঋতুচক্র, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্ম, মেনোপজ— প্রতিটি ধাপে হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় শরীরের চাহিদা এবং রোগের ঝুঁকিও। অথচ স্বাস্থ্য পরিষেবার বড় অংশ এখনও সেই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি তাল মেলাতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদ্রোগও এর অন্যতম উদাহরণ। পুরুষদের মতো বুকে তীব্র ব্যথা না হয়ে অনেক মহিলার ক্ষেত্রে ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট বা অস্বস্তিই হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়, বাড়ে জটিলতার ঝুঁকি।
তাই চিকিৎসকদের বক্তব্য, নারীদের স্বাস্থ্যকে শুধু মাতৃত্ব বা প্রজনন স্বাস্থ্য দিয়ে বিচার করলে চলবে না। কৈশোর থেকে বার্ধক্য— জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যনীতি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা এখন সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্য, শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া— এই কয়েকটি অভ্যাসই দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে সুস্থতাও নিশ্চিত করতে পারে।
চিকিৎসকদের কথায়, শুধু আয়ু বাড়লেই হবে না। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি জীবন, যেখানে বছর বাড়বে, কিন্তু সেই বছরগুলো কেড়ে নেবে না সুস্থতা।