খড়্গপুর: আইআইটি খড়্গপুরে একের পর এক পড়ুয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে যখন প্রশ্নের মুখে দেশের অন্যতম সেরা এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, তখন সেই বিতর্কে স্পষ্ট অবস্থান জানালেন আইআইটির ডিরেক্টর অধ্যাপক সুমন চক্রবর্তী। তাঁর বক্তব্য, পড়াশোনার চাপকে সব ছাত্রমৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখাটা ভুল। বরং তাঁর দাবি, ২০ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে একাডেমিক চাপের যোগ থাকতে পারে। অধিকাংশ ঘটনাই ব্যক্তিগত ও সামাজিক নানা সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সম্প্রতি আইআইটি খড়্গপুরের ৭২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সুমন চক্রবর্তী বলেন, “একটি ছাত্রমৃত্যুও আমাদের কাছে কাম্য নয়। কিন্তু সম্পূর্ণ ঘটনা না জেনে শুধুমাত্র পড়াশোনার চাপকে দায়ী করা ঠিক নয়। ছাত্রদের জীবনে এমন বহু ব্যক্তিগত ও সামাজিক সমস্যা থাকে, যেগুলি বাইরে থেকে বোঝা যায় না।”
দেশের বৃহত্তম আবাসিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইআইটি খড়্গপুরে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার পড়ুয়া পড়াশোনা করছেন। এ বছরের সমাবর্তনে ৩,৯৩৬ জন ছাত্রছাত্রী ডিগ্রি ও সম্মাননা লাভ করেন। প্রযুক্তি, গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সাফল্যের পাশাপাশি ছাত্রমৃত্যুর ঘটনাগুলিও গত কয়েক বছরে বারবার শিরোনামে এসেছে।
ডিরেক্টরের দাবি, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। 'সেতু' অ্যাপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা, নিয়মিত কাউন্সেলিং, ফ্যাকাল্টি অ্যাডভাইজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ওয়ার্ডেন এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পড়ুয়াদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
সুমন চক্রবর্তীর কথায়, “প্রতিদিনই এমন অনেক ঘটনা সামনে আসে, যেখানে সময়মতো হস্তক্ষেপ করে পড়ুয়াদের বিপদ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে। সেখান থেকেই আমরা শিক্ষা নিচ্ছি। শুধু এআই বা শুধু কাউন্সেলর— কোনও একটি ব্যবস্থা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মানবিক সংযোগ এবং প্রযুক্তি— দুটিকেই একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের ঘটনা অনেকটা রোগের মতো। যত দ্রুত সমস্যার লক্ষণ শনাক্ত করা যাবে, তত দ্রুত সংশ্লিষ্ট পড়ুয়াকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
অভিভাবকদের প্রতিও একটি আবেগঘন বার্তা দেন ডিরেক্টর। তাঁর কথায়, “আমি সব সময় বলি, আমাদের ছেলে-মেয়েরা হয়তো খুব বড় বেতন না-ও পেতে পারে, কিন্তু তারা যেন সুস্থভাবে বেঁচে থাকে। সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
খড়্গপুর আইআইটির ছাত্রমৃত্যু নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি অন্য আইআইটির উদাহরণও টানেন। তাঁর দাবি, গত এক দশকে কানপুর আইআইটিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে ছাত্রমৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি। খড়্গপুরে পড়ুয়ার সংখ্যা বেশি হওয়ায় ঘটনাগুলিও বেশি চোখে পড়ে। তবে তাই বলে একটি মৃত্যুকেও হালকাভাবে দেখা যায় না।
সমাবর্তনে উপস্থিত একাধিক অভিভাবকেরও বক্তব্য, ছাত্রদের ব্যক্তিগত সমস্যাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। অনেকের মতে, প্রতিটি ঘটনার আলাদা কারণ থাকে এবং সব ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি খোঁজা ঠিক নয়। তবে আরও সক্রিয় কাউন্সেলিং ও নিয়মিত মানসিক সহায়তার ব্যবস্থার উপর জোর দেন তাঁরা।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল আইআইটি খড়্গপুরের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র জয়বীর সিং দোডিয়া-র দেহ অটলবিহারী বাজপেয়ী হলের নীচে উদ্ধার হয়। পুলিশ সূত্রে দাবি, তিনি ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর গত ১৬ মাসে আইআইটি খড়্গপুরে মোট ৯ জন পড়ুয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। এর আগের বছরেও সাতজন পড়ুয়ার মৃত্যু ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই ছাত্রদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিশেষ জোর দিয়ে একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবুও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— এতসব ব্যবস্থার পরও কেন থামছে না দেশের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ছাত্রমৃত্যুর মিছিল?




