কলকাতা: জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্র ইস্যু নিয়ে বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। এ বার থেকে আর কোনও পুরপ্রধান, পঞ্চায়েত প্রধান বা অন্য কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি জন্ম বা মৃত্যুর শংসাপত্র দিতে পারবেন না। এই গুরুত্বপূর্ণ নথি ইস্যুর সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে শুধুমাত্র সরকারি আধিকারিকদের হাতে। বৃহস্পতিবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে এই ঘোষণা করেন মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল।
সরকারের দাবি, সাম্প্রতিক ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR)-এর সময় বিপুল সংখ্যক জাল জন্ম শংসাপত্রের হদিস মিলেছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই গোটা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই স্বাস্থ্য দফতর বিজ্ঞপ্তি জারি করে কোন এলাকায় কোন সরকারি আধিকারিক এই দায়িত্ব পালন করবেন, তা জানিয়ে দেবে।
কেন এই সিদ্ধান্ত? এসআইআরেই সামনে এল ‘জাল শংসাপত্র’ চক্র
মুখ্যসচিবের বক্তব্য, জন্ম শংসাপত্র শুধুমাত্র একটি পরিচয়পত্র নয়, নাগরিকত্ব, ভোটার তালিকায় নাম তোলা, শিক্ষা, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক পরিষেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি। কিন্তু এসআইআর চলাকালীন বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, ভুয়ো বা জাল জন্ম শংসাপত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
মনোজ আগরওয়াল বলেন, “জন্ম শংসাপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি। নির্বাচনের পরে অসংখ্য অভিযোগ এসেছে। এসআইআর করতে গিয়ে বহু অনিয়ম ধরা পড়েছে। পুলিশের কাছেও অভিযোগ এসেছে। বহু জায়গায় নকল জন্ম শংসাপত্র পাওয়া গিয়েছে।”
তাঁর অভিযোগ, নিয়ম থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে সেই নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ হয়নি। তার সুযোগ নিয়ে একটি চক্র ভুয়ো নথি তৈরি করে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করেছে।
১৯৯৭ সাল থেকে সমস্ত শংসাপত্রের পুনর্যাচাই
শুধু নতুন ব্যবস্থা চালু করাই নয়, অতীতের নথিও খতিয়ে দেখবে রাজ্য। নবান্ন জানিয়েছে, ১৯৯৭ সাল থেকে রাজ্যে নথিভুক্ত সমস্ত জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্র পুনরায় যাচাই করা হবে। সেই তথ্য ডিজিটাল আকারে সংরক্ষণ করে একটি অভিন্ন তথ্যভান্ডার (Unified Database) তৈরি করা হবে, যা কেন্দ্রীয় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন পোর্টালের সঙ্গেও যুক্ত থাকবে।
সরকারি সূত্রের দাবি, এর ফলে ভবিষ্যতে একই ব্যক্তির নামে একাধিক শংসাপত্র বা ভুয়ো নথি তৈরি করা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়বে।
বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা, শুনানির পর মিলবে শংসাপত্র
মুখ্যসচিব জানিয়েছেন, শুধু পুরনো নথি যাচাই নয়, বাড়ি বাড়ি সমীক্ষাও চালানো হবে। যাঁদের কাছে বৈধ জন্ম শংসাপত্র নেই, তাঁদের আবেদন গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের পর শুনানির মাধ্যমে শংসাপত্র দেওয়া হবে। অন্যদিকে, তদন্তে যদি কোনও শংসাপত্র ভুয়ো বলে প্রমাণিত হয়, তা বাতিল করা হবে।
মুখ্যসচিব বলেন, "অবৈধ শংসাপত্র বাতিল হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও নথিও খতিয়ে দেখা হবে। কোনও অবৈধ বিদেশি নাগরিক এখানে থাকতে পারবেন না।" এই মন্তব্যকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্কুলের নথিতেও জাল জন্ম শংসাপত্রের ব্যবহার!
নবান্নের দাবি, তদন্তে এমন ঘটনাও সামনে এসেছে, যেখানে বিদ্যালয়ের ভর্তি বা স্কুল সার্টিফিকেট তৈরির সময় ভুয়ো জন্ম শংসাপত্র ব্যবহার করা হয়েছে। সরকারের মতে, এই ধরনের অনিয়মের ফলে প্রকৃত নাগরিকরাও নানা প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়ছেন।
মুখ্যসচিব বলেন, “কিছু মানুষের অনিয়মের জন্য বহু সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সমস্ত তথ্য স্ক্যান করে ডিজিটাল আকারে সংরক্ষণ করা হবে। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে।”
সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রমাণিত হলেও কড়া ব্যবস্থা
দায়িত্ব এবার সরকারি আধিকারিকদের হাতে গেলেও তাঁদের জন্যও কড়া বার্তা দিয়েছে নবান্ন। মুখ্যসচিব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কোনও আধিকারিক যদি বেআইনি ভাবে শংসাপত্র ইস্যু করেন বা দুর্নীতিতে যুক্ত থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধেও কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, “এটি কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। যাচাইয়ের কাজ শুধুমাত্র সরকারি আধিকারিকরাই করবেন। কোনও চুক্তিভিত্তিক কর্মী এই কাজে যুক্ত থাকবেন না। সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।”
রাজ্যজুড়ে পুলিশের অভিযান শুরু
এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায় পুরসভা ও পঞ্চায়েত অফিসে অভিযান শুরু হয়েছে। জন্ম ও মৃত্যুর রেজিস্টার খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোথায় কীভাবে শংসাপত্র ইস্যু হয়েছে, তার নথিও পরীক্ষা করছেন তদন্তকারীরা। প্রয়োজনে পুরনো রেকর্ড বাজেয়াপ্ত করেও তদন্ত এগোতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
রাজনৈতিক তাৎপর্যও দেখছেন বিশ্লেষকেরা
প্রশাসনের দাবি, এটি সম্পূর্ণ দুর্নীতি রোধ ও স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই সিদ্ধান্তে অন্য ইঙ্গিতও দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের পরও রাজ্যের অধিকাংশ পুরসভা ও পঞ্চায়েত এখনও প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে জন্ম-মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ শংসাপত্র ইস্যুর ক্ষমতা জনপ্রতিনিধিদের হাত থেকে সরিয়ে সরাসরি প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এর রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।
তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের একাংশের প্রশ্ন, দায়িত্ব শুধু জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে সরকারি আধিকারিকদের হাতে গেলেই কি দুর্নীতি সম্পূর্ণ বন্ধ হবে? যথাযথ নজরদারি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, নিরপেক্ষ অডিট এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা না থাকলে নতুন ব্যবস্থাতেও অনিয়মের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেই কারণেই এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তার বাস্তবায়নের উপর।