কলকাতা: আষাঢ়ের আকাশে মেঘের আনাগোনা। মাঝেমধ্যে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, আবার কখনও রোদের ঝলক। এই চিরচেনা বর্ষার আবহেই দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালির অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব— রথযাত্রা। বৃহস্পতিবার একসঙ্গে উৎসবের রঙে রাঙাবে সমুদ্রের শহর দিঘা, গঙ্গাপাড়ের মাহেশ, মহানগর কলকাতা-সহ গোটা বাংলা। কোথাও শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, কোথাও নতুন ইতিহাসের সূচনা। আর সেই আবহের মধ্যেই এ বার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় দিঘার জগন্নাথধাম।
মাত্র দ্বিতীয় বছরেই দিঘার রথযাত্রাকে পুরীর ঐতিহ্যের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। এ বার প্রথমবারের মতো মহাপ্রভু জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার শিরে শোভা পাবে পুরী থেকে আনা বিশেষ 'রাজমুকুট'। পুরীর রাজবেশের আদলেই সাজানো হবে তিন দেবতাকে। মন্দির কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, শুধু রথযাত্রা আয়োজন করাই নয়, ধাপে ধাপে দিঘাকে এমন একটি ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই লক্ষ্য, যেখানে ভক্তরা পুরীর আবহ অনুভব করতে পারবেন।
স্নানযাত্রার পর অনসর পর্ব শেষ করে নবযৌবন দর্শনের মধ্য দিয়ে ভক্তদের সামনে আসবেন মহাপ্রভু। তার পরদিন পাহাণ্ডি বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেববিগ্রহকে রথে প্রতিষ্ঠা করা হবে। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হবে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতীক্ষিত রথযাত্রা। গত বছরের তুলনায় এ বার ভক্তসমাগম আরও অনেক বেশি হবে বলেই মনে করছে প্রশাসন। ইতিমধ্যেই দিঘার অধিকাংশ হোটেল প্রায় পূর্ণ। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং অসম থেকেও বহু ভক্ত পৌঁছতে শুরু করেছেন সমুদ্র শহরে।
ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রযুক্তির হাত মেলানো
এ বারের দিঘার রথযাত্রার সবচেয়ে অভিনব দিক নিঃসন্দেহে রথের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। গত বছর বিশাল রথ ঘোরানোর সময় কিছু সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল। কারণ, দিঘার রথের পথ পুরীর মতো দীর্ঘ ও একেবারে সোজা নয়। একাধিক বাঁক থাকায় রথ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এ বার রথে আনা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। বসানো হয়েছে নতুন চাকা। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো রাখা হয়েছে স্টিয়ারিং ও ব্রেকের ব্যবস্থা। আয়োজকদের দাবি, রথের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় রীতিতে কোনও পরিবর্তন না এনে কেবল নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের সুবিধার জন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। লক্ষাধিক মানুষের ভিড়ের মধ্যে যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে দিকেই বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।
মাহেশে শতাব্দী পেরিয়ে আজও অটুট ঐতিহ্য
রথযাত্রার কথা উঠলেই বাংলায় যে নামটি প্রথম সারিতে আসে, সেটি মাহেশ। হুগলির এই জনপদে প্রায় ৬৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ইতিহাস বলছে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে এই রথযাত্রার সূচনা। সেই থেকে প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয় মাহেশে।
বিশাল কাঠের রথ, রশিতে টান দেওয়ার জন্য মানুষের ঢল, মেলা, প্রসাদ, কীর্তন— সব মিলিয়ে মাহেশে রথযাত্রা আজও বাংলার অন্যতম বড় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। এ বছরও ভিড় সামাল দিতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন। পুলিশ, সিভিল ডিফেন্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কলকাতাতেও উৎসবের রঙ
রথযাত্রার আবহে পিছিয়ে নেই কলকাতাও। ইস্কনের উদ্যোগে শহরের অন্যতম বড় রথযাত্রা বের হবে মধ্য কলকাতা থেকে। কীর্তন, ভজন, শঙ্খধ্বনি এবং হাজার হাজার ভক্তের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে শহরের একাধিক রাস্তা। রথযাত্রা উপলক্ষে বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা করেছে কলকাতা পুলিশ। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। নিরাপত্তার জন্য থাকছে অতিরিক্ত পুলিশ, নজরদারি ক্যামেরা এবং কুইক রেসপন্স টিম।
বৃষ্টি কি উৎসবে বাধা দেবে?
রথযাত্রার আগে ভক্তদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আকাশের দিকে তাকিয়েই— বৃষ্টি হবে কি?
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, রথযাত্রার দিন দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম-সহ উপকূলবর্তী এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি। কলকাতা এবং সংলগ্ন জেলাগুলির জন্য ভারী বৃষ্টির সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া একটি ঘূর্ণাবর্ত এবং সক্রিয় দুটি মৌসুমি অক্ষরেখার প্রভাবেই দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই দুই আবহাওয়াগত ব্যবস্থার জেরে আগামী কয়েক দিন টানা বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বৃষ্টি হলেও গরম থেকে খুব একটা স্বস্তি মিলবে না। কারণ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। ফলে আর্দ্রতাজনিত ভ্যাপসা গরম ও অস্বস্তি বজায় থাকবে। অর্থাৎ, একদিকে বৃষ্টির ফোঁটা, অন্যদিকে ঘাম— দুইয়ের সঙ্গেই মানিয়ে নিয়েই উৎসবে শামিল হতে হবে ভক্তদের। আবহাওয়া দফতর তাই রথযাত্রায় অংশ নিতে যাওয়া মানুষের জন্য ছাতা বা রেনকোট সঙ্গে রাখার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জল পান করার পরামর্শ দিয়েছে।
আবেগ, ঐতিহ্য আর অপেক্ষার দিন
রথযাত্রা শুধুই একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। দিঘায় নতুন ইতিহাস, মাহেশে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, কলকাতায় নগরজীবনের উৎসব— সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার গোটা বাংলা জগন্নাথময় হয়ে উঠবে।
আকাশে যদি মেঘও জমে, তাতেও উৎসবের আবেগে ভাটা পড়বে না। কারণ বৃষ্টি হোক বা রোদ— রথের রশিতে হাত রেখে মহাপ্রভুর আশীর্বাদ পাওয়ার বিশ্বাসই প্রতি বছর লাখো মানুষকে পথে নামায়। এ বারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই।