শিলিগুড়ি,: সংখ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কি বেড়েছে শিক্ষার পরিকাঠামো? উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজ্যের ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে সেই প্রশ্নই কার্যত সামনে তুলে ধরলেন রাজ্যপাল তথা আচার্য আর. এন. রবি।
বৈঠকে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আলিপুরদুয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ব বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়, কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষিণ দিনাজপুর বিশ্ববিদ্যালয়, দার্জিলিং হিলস ইউনিভার্সিটি, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, হরিচাঁদ গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয়, হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়, কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয়, মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়, মুর্শিদাবাদের মহারাজ কৃষ্ণনাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, রানী রাসমণি গ্রিন ইউনিভার্সিটি, ঝাড়গ্রামের সাধু রামচাঁদ মুর্মু বিশ্ববিদ্যালয়, দ্য সংস্কৃত কলেজ অ্যান্ড ইউনিভার্সিটি, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগত, প্রশাসনিক, আর্থিক ও পরিকাঠামোগত পরিস্থিতির রিপোর্ট শোনার পর রাজ্যপাল স্পষ্ট ভাষায় জানান, গত ১০-১২ বছরে প্রতিষ্ঠিত একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় যথাযথ পরিকল্পনা ও আন্তরিক সদিচ্ছা ছাড়াই গড়ে তোলা হয়েছে। তাঁর কথায়, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে ওঠেনি। এখনও অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন বা অস্থায়ী ক্যাম্পাস থেকেই তাদের কাজ চালাতে হচ্ছে।
শুধু পরিকাঠামো নয়, বৈঠকে উঠে এসেছে একের পর এক উদ্বেগজনক তথ্য। বহু বিশ্ববিদ্যালয় চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে। ছাত্রভর্তির হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। স্থায়ী শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মী ও প্রশাসনিক কর্মীর তীব্র অভাব রয়েছে। ন্যূনতম শিক্ষাগত পরিকাঠামোর অভাবে স্বাভাবিক কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে। রাজ্যপালের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু শিক্ষার মান নয়, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে আসে সমাবর্তন না হওয়ার সমস্যা। বৈঠকে জানানো হয়, বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরের পর বছর সমাবর্তন অনুষ্ঠান হয়নি। ফলে হাজার হাজার পড়ুয়া পড়াশোনা শেষ করেও এখনও মূল ডিগ্রি শংসাপত্র হাতে পাননি। উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, চাকরির আবেদন এবং পেশাগত জীবনে এর জেরে তাঁরা সমস্যার মুখে পড়ছেন।
এই পরিস্থিতিকে 'সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য' বলে মন্তব্য করে আচার্য সমস্ত উপাচার্যকে নির্দেশ দেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও সংবিধিবদ্ধ বিধান মেনে দ্রুত সমাবর্তনের আয়োজন করতে হবে এবং যোগ্য শিক্ষার্থীদের হাতে অবিলম্বে ডিগ্রি শংসাপত্র তুলে দিতে হবে।
রাজ্যপাল আশ্বাস দেন, রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভিতকে নতুন করে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বৈঠকে উপস্থিত উপাচার্য ও প্রতিনিধিরাও তাঁদের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক, প্রশাসনিক ও পরিকাঠামোগত সমস্যার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন এবং তা কাটিয়ে ওঠার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আচার্যের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন।
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বৈঠক রাজ্যের উচ্চশিক্ষা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, সেই প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রকৃত অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে পরিকাঠামো, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষক নিয়োগ এবং নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এমনই ইঙ্গিত মিলেছে আচার্যের বক্তব্যে।