রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙন আরও প্রকট হচ্ছে। একের পর এক নেতা-সাংসদের দলত্যাগের আবহে এবার দল ছাড়তে ইচ্ছুকদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "ইডি, সিবিআই বা বিজেপির চাপে যাঁদের যাওয়ার আছে, তাঁরা ২১ জুলাইয়ের আগে চলে যান। লোটাকম্বল নিয়ে চলে যান।" রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই মন্তব্য শুধু দলত্যাগীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা নয়, বরং ২১ জুলাইয়ের পর নতুন করে দল গড়তে উদ্যোগী হচ্ছেন তিনি।
বুধবার বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেন একদা মমতার ছায়াসঙ্গী ও প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র। তার পরদিনই রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর দিল্লিতে বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে বৈঠক করেন কোয়েল মল্লিক। এই ঘটনাক্রমের পরই মমতার প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদিও তিনি কারও নাম নেননি, তবু বলেন, “দেখলাম আরও এক সাংসদ, চলচ্চিত্রশিল্পী বিজেপির এক নেতার সঙ্গে বৈঠক করে পদত্যাগ করলেন। তিনি আগেই ইমেলে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছিলেন, পরে সশরীরে গিয়ে পদত্যাগ করেছেন।”
দলত্যাগ প্রসঙ্গে মমতা স্পষ্ট করে জানান, এতে তৃণমূল দুর্বল হবে না। তাঁর বক্তব্য, "যাঁরা থাকবেন, তাঁরাই সোনার খনি।" পাশাপাশি দাবি করেন, দল ছেড়ে যাওয়া অনেক নেতাই এখনও গোপনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
বক্তব্যের শেষ অংশে মমতার একটি মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মমতা বলেন, "বিজেপি বলছে নামও রাখব না, নিশানও রাখব না। অনেক দল অনেক বার প্রতীক বদল করেছে।" এরপরই বিজেপিকে কটাক্ষ করে তাঁর সংযোজন, "ক্ষমতার জোরে দলের নাম পরিবর্তন করা যেতে পারে, কিন্তু কোনও দলের আদর্শ, লক্ষ্য বা দৃষ্টিভঙ্গি বদল করা যায় না।"
এদিন বিজেপির বিরুদ্ধেও সরব হন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার চাপ, প্রশাসনিক ভয় দেখানো এবং অর্থের প্রলোভনের মাধ্যমে তৃণমূলে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা চলছে। এমনকি ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলিকেও চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মমতা। তিনি বলেন, "দিল্লির মদতে যা ইচ্ছা করছেন। আগে দিল্লিটাকে সামলান।" পাশাপাশি লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন প্রসঙ্গ টেনে কেন্দ্রের ভূমিকারও সমালোচনা করেন তিনি।
২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসকে সামনে রেখে আদালতের নির্দেশ মেনে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আবেদনও করেন তিনি।
উল্লেখ্য, বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই তৃণমূলে ভাঙনের ছবি ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। দলের একাধিক বিধায়ক ও সাংসদ বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন। এবং তাতে রাজ্যে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। এই পরিস্থিতিতে ২১ জুলাইয়ের আগে দলত্যাগীদের উদ্দেশে মমতার নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং দল ও প্রতীক পরিবর্তন প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক অন্দরে নতুন করে জল্পনা উসকে দিয়েছে। এখন রাজনৈতিক মহলের নজর ২১ জুলাইয়ের পর কালীঘাট তৃণমূলের ভবিষ্যৎ কৌশল এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পদক্ষেপ কি হয় সেদিকে।