দিব্যেন্দু ঘোষ: আমাদের ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনে এমন কিছু দিন আসে, যা ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আমাদের হঠাৎ থামিয়ে দেয়। শেকড়ের টান মনে করিয়ে দেয়। তেমনই এক বিশেষ দিন দাদু-দিদিমা দিবস। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় রবিবার এই দিনটি পালিত হয়। সম্পর্কের এই পবিত্র দিনটি সন্তান, নাতিপুতি ও দাদু-দিদার গভীর অদৃশ্য বন্ধনকে উদযাপন করে। ১৯৭৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সইয়ে এই দিবসের সূচনা হলেও, এর মূল সুর জড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর প্রতিটা কোণায় ছড়িয়ে থাকা প্রবীণ মানুষদের নিঃস্বার্থ ভালবাসার সঙ্গে।
ভারতের পারিবারিক সংস্কৃতিতে দাদু-দিদিমা মানেই বিশাল ছায়াঘেরা বটবৃক্ষ। যৌথ পরিবার বা অনুসারী একক পরিবার, নাতি-নাতনিদের কাছে তাদের দাদু-দিদিমা একাধারে বন্ধু, গল্পকার এবং পরম রক্ষাকর্তা। অফিসফেরত বাবা-মায়ের কড়া শাসনের আড়ালে যে চোখ দুটো আমাদের অনৈতিক বায়নাকেও প্রশ্রয় দিত, তাঁরাই হলেন আমাদের দাদু-দিদা। সন্ধে নামলেই রূপকথার রাজপুত্রের ঘোড়া ছোটানো, ঠাকুরমার ঝুলির রাক্ষস-খোক্কসের গল্প কিংবা দাদুর হাত ধরে পাড়ার দোকান থেকে লজেন্স কেনার স্মৃতি আমাদের শৈশবের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
কবি জয় গোস্বামীর সেই চিরচেনা পঙক্তিগুলোর মতো মনে পড়ে যায়— স্মৃতির গভীরে থাকা সেই মানুষগুলোর কথা, যাঁরা আমাদের শৈশবকে ঋদ্ধ করেছেন। আজ ভারতে ঘটা করে নানা প্রতিষ্ঠানে বা পরিবারের অন্দরে এই দিনটি উদযাপিত হয়। ছোট ছোট উপহার, কার্ড কিংবা একটুখানি সময় কাটানোর মাধ্যমে প্রবীণদের মুখের কোণে হাসি ফোটানোর চেষ্টা চলে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই বিশেষ দিনটির বাইরেও বছরের বাকি দিনগুলোতে আমরা তাঁদের কতটা খোঁজ রাখি?
আজকের আধুনিক যুগে দ্রুত বদলাচ্ছে সমাজ। মুদ্রার উল্টো পিঠে এক নির্মম সত্য মাথাচাড়া দিচ্ছে। জীবনযাত্রার ইঁদুরদৌড়, গ্ল্যামারাস কেরিয়ার আর নিউক্লিয়ার পরিবারের সংকীর্ণতায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা যখন হু হু করে বাড়ছে, তখন বহু ছেলেমেয়ে তাদের বার্ধক্যে উপনীত বাবা-মাকে পাঠিয়ে দিচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমের মলিন বেড়াজালে, নিঃসঙ্গ ঘেরাটোপে। যে বাবা-মা নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষ করে তুলেছেন, আজ বার্ধক্যে এসে তাঁদের ঠিকানা হচ্ছে অবহেলার চার দেওয়াল। জীবন যেন আজ এক নিষ্ঠুর উপহাসে পরিণত হয়েছে।
বিখ্যাত গায়ক নচিকেতা চক্রবর্তীর সেই গানটির কথা মনে পড়ে যায়, যেখানে খুব আক্ষেপের সুরে গীত হয় মানুষের এই আত্মকেন্দ্রিকতার কথা। বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সাদা চুলে মোড়া ক্লান্ত মুখগুলোর দিকে তাকালে বুক কেঁপে ওঠে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এই মানুষগুলোর পরম প্রাপ্তি ছিল কেবল একটু সঙ্গ, একটু নাতির হাতের ছোঁয়া বা নাতনির মিষ্টি ডাক। অথচ আধুনিকতার এই রূঢ় বাস্তবতায় তাঁরা আজ বড্ড একা, বড্ড উপেক্ষিত।
এই নির্মমতার ভিড়েই আবার অন্য এক চিত্রও চোখে পড়ে। বহু পরিবারে, যেখানে বাবা-মা দুজনেই জীবিকার টানে সারাদিন ঘরের বাইরে থাকেন, সেই ছোট্ট শিশুদের জীবনে একমাত্র প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠেন তাদের দাদু-দিদিমা। সন্তানের শারীরিক সুস্থতা থেকে শুরু করে মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশ, সবকিছুর আবর্তে প্রবীণরাই হয়ে ওঠেন অভিভাবক। নাতি-নাতনির কাছে তাদের দাদু-দিদিমা কেবল রক্তমাংসের মানুষ নন, তাঁরা হলেন প্রাণের চেয়েও প্রিয় কোনও আশ্রয়।
স্কুল থেকে ফিরে কার কোলে মাথা রেখে দিন শেষের ক্লান্তি দূর হবে? কার পকেট থেকে লুকিয়ে বেরোবে পেয়ারা বা চকোলেট? এই সব সহজ সরল আবেগের জাল বুনেই তৈরি হয় নাতি-নাতনির পৃথিবী। কবি জয় গোস্বামীর কবিতার মতো যেন মনে হয়, এই প্রবীণ মানুষগুলোর চোখের তারায় আজও মেখে রয়েছে ঝিলমিল করা শৈশব। তাঁদের কাছে আমাদের ঋণ কোনওদিন শোধ করার নয়।
দাদু-দিদা দিবস শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় একটা লাল দাগ নয়; এটা আত্মসমালোচনার দিনও। বৃদ্ধ বয়সের নিঃসঙ্গতাকে দূর করার একমাত্র ওষুধ হল ভালবাসা। আমাদের বুঝতে হবে, আজকের তরুণ প্রজন্মও একদিন বার্ধক্যের দোড়গোড়ায় এসে দাঁড়াবে। আজ আমরা প্রবীণদের সঙ্গে যেমন আচরণ করব, আগামী দিনে আমাদের সন্তানরাও আমাদের সঙ্গে ঠিক তেমনই আচরণ করবে। তাই বৃদ্ধাশ্রমের করুণ দৃশ্যগুলোকে মুছে ফেলে প্রতিটি ঘরে ফিরিয়ে দিতেই হবে প্রবীণদের যথাযথ সম্মান। কাজের হাজার ব্যস্ততার মাঝেও তাঁদের পাশে বসে একটু কথা বলা, তাঁদের পুরনো স্মৃতির গল্পগুলো মন দিয়ে শোনা, এটুকুই তো তাঁদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন।
আন্তর্জাতিক এই দিবসে শুধু সোশাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট না করে, আমরা না হয় প্রতিশ্রুতি নিই, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের দাদু-দিদিমাদের মুখে যেন কোনওভাবেই অবহেলার মলিনতা না আসে। তাঁরা ভাল থাকুন, হাসিখুশি থাকুন আমাদেরই চেনা ছায়ায়। আসলে জীবন যখন তার অন্তিম সঙ্কেতে পৌঁছয়, তখন মানুষের চাওয়ার পরিধি বড্ড সংকুচিত হয়ে আসে। বিশাল কোনও প্রাসাদ বা বিলাসবহুল জীবন নয়, বার্ধক্যের এই পড়ন্ত বেলায় তাঁদের কেবল প্রয়োজন হয় একটুখানি উষ্ণ সান্নিধ্য, আর একফালি নির্ভরতার আকাশ।
অথচ আমাদের সমাজের যান্ত্রিক গতিশীলতা আজ প্রবীণ মানুষদের ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর নিঃসঙ্গতার দিকে। একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, যে হাতগুলো একদিন আমাদের কচি আঙুল ধরে হাঁটা শিখিয়েছিল, আজ বার্ধক্যের ভারে সেই হাতগুলোই কাঁপছে। সেই কাঁপাকাঁপা হাতে একটু জলের গ্লাস বাড়িয়ে দেওয়া বা কাজের ফাঁকে দিনে অন্তত দশটা মিনিট তাঁদের পাশে বসা, এটুকু সহানুভূতি কি আমরা দিতে পারি না?
রক্তের সম্পর্কের টান যখন স্বার্থের চোরাবালিতে হারিয়ে যায়, তখন বৃদ্ধাশ্রমের চার দেওয়াল যেন এক জীবন্ত সমাধিক্ষেত্র হয়ে ওঠে। অথচ এই মানুষগুলোই তো আমাদের নাড়ির সংযোগ, আমাদের না বলা কথার সবচেয়ে নিরাপদ সিন্দুক। তাঁরা যখন আমাদের শৈশবের জ্বর-বমি বা জেদের রাতে নির্ঘুম কাটিয়েছেন, তখন তাঁরা তো কোনও হিসাব কষেননি। তাহলে আজ কেন বৃদ্ধ বয়সে এসে তাঁদের তিলে তিলে ত্যাগের বিনিময়ে আমরা উপহার দিই অবহেলা আর একাকীত্ব? এই দ্বিমুখী সমাজব্যবস্থা এবং আমাদের অন্তহীন উদাসীনতা আজ এক গভীর নৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
একসময়ের যৌথ পরিবারগুলোতে দাদু-দিদাদের উপস্থিতি ছিল অলিখিত ছাতার মতো। সন্ধ্যায় উঠোনে গোল হয়ে বসে রূপকথার গল্প শোনা, রামায়ণ-মহাভারতের নানা ঘটনার সঙ্গে নীতিশিক্ষা দেওয়া কিংবা ছোট্ট কোনও ভুল হলে পরম স্নেহে পিঠে হাত বুলিয়ে দেওয়া— এই সব ছোট ছোট উপাদানই একটি শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ করে তোলে। আজকের ফ্ল্যাট সংস্কৃতির যুগে ঘরগুলো আকারে ছোট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মনগুলো আরও বেশি সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। নাতি-নাতনিরা আজ কার্টুন নেটওয়ার্ক আর মোবাইল স্ক্রিনের আলোয় বুঁদ হয়ে থাকে; তারা জানে না যে এর বাইরেও দাদু-দিদার ঝুলিতে কত শত না-বলা গল্প জমে আছে।
কবি জয় গোস্বামীর কবিতার আকুতির মতো আমাদের চারপাশের বাতাসেও যেন এক দীর্ঘশ্বাস ভেসে বেড়ায়, যেখানে ফেলে আসা দিনগুলোর জন্য মন কেমন করে ওঠে। দাদু-দিদিমার মুখের বলিরেখাগুলো কেবল বয়সের ছাপ নয়, ওগুলো একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিলে তিলে একটা পরিবারকে তেরো নদী পার করে আজকের এই জায়গায় দাঁড় করানোর নামই তো দাদু-দিদিমা। তাঁদের সেই অমূল্য অভিজ্ঞতা ও জীবনদর্শনের ভাণ্ডার থেকে যদি আজকের প্রজন্ম বঞ্চিত হয়, তবে তা হবে আমাদের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনা। প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে বটে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের দূরত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বৃদ্ধাশ্রম কোনও আশ্রয়ের জায়গা হতে পারে না, এটা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের করুণ দলিল। যে পিতা-মাতা নিজেদের জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে আমাদের মানুষ করেছেন, তাঁদের শেষ বয়সটা যেন কোনওভাবেই বারান্দার গ্রিলে চোখ রেখে পথের দিকে চেয়ে কাটাতে না হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবীণরাই সমাজের মূল ভিত্তি। তাঁরা আমাদের অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যেকার জীবন্ত সেতু। সন্তানদের সামনে বাবা-মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার যে দৃষ্টান্ত আমরা স্থাপন করব, আমাদের সন্তানরাও অবিকল সেই শিক্ষাই গ্রহণ করবে।
তাই চক্রাকারে ঘুরে আসা এই নিয়মের বেড়াজালে আজ সময় এসেছে নিজেদের ভেতরকার মনুষত্বকে জাগিয়ে তোলার। সমস্ত ব্যস্ততা আর কৃত্রিমতার দেওয়াল ভেঙে আজকের এই দিনে আমাদের দাদু-দিদিমাদের বা বার্ধক্যের কোণায় লুকিয়ে থাকা মানুষগুলোর হাত শক্ত করে ধরা আশু কর্তব্য। তাঁদের মুখের ঝুলে পড়া চামড়ার হাসিতে ফিরিয়ে দিতে হবে জীবনের হারানো রং। তবেই দাদু-দিদা দিবসের প্রকৃত সার্থকতা খুঁজে পাবে আমাদের এই ধরণী, আর ভালবাসার আলোয় আলোকিত হবে প্রতিটা ঘরের প্রাঙ্গণ।