কলকাতা: রাজনীতিতে সময়ের হিসেব কখনও কখনও ঘড়ির কাঁটাকেও হার মানায়। বৃহস্পতিবার তারই সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ। দুপুরে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপির পতাকা হাতে তুললেন সুখেন্দু শেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইক। সন্ধ্যা নামার আগেই তিন জনের নাম ঘোষণা হয়ে গেল রাজ্যসভার উপনির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এত দ্রুত মনোনয়ন শুধু সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।
ক্ষমতার পালাবদলের পর পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক পরিসর আরও দৃঢ় করতে মরিয়া বিজেপি। সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তিন প্রাক্তন তৃণমূল নেতাকে শুধু দলে নেওয়াই নয়, সরাসরি উচ্চকক্ষের প্রার্থী করে দিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এতে একদিকে যেমন নতুন মুখদের প্রতি দলের আস্থা প্রকাশ পেল, অন্যদিকে তৃণমূলের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তাও পৌঁছে গেল— গেরুয়া শিবিরে এলে শুধু রাজনৈতিক আশ্রয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও মিলতে পারে।
তিন জনের রাজনৈতিক পরিচয়ও আলাদা গুরুত্ব বহন করে। সংসদীয় প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক প্রশ্নে বরাবরই সরব ছিলেন সুখেন্দু শেখর রায়। বরাক উপত্যকা থেকে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ সুস্মিতা দেব দীর্ঘদিন সংসদে সক্রিয় ছিলেন। অন্যদিকে আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে প্রকাশ চিক বরাইকের উপস্থিতি বিজেপির সামাজিক সমীকরণকেও আরও বিস্তৃত করতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
বৃহস্পতিবার কলকাতায় বিজেপির রাজ্য দফতরে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের উপস্থিতিতে গেরুয়া শিবিরে যোগ দেন তিন জন। যোগদানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পশ্চিমবঙ্গের তিনটি রাজ্যসভা আসনের জন্য তাঁদের নাম ঘোষণা করে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ঘটনাক্রম মোটেই কাকতালীয় নয়; বরং সুচিন্তিত রাজনৈতিক বার্তা।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিজেপি এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দু'টি লক্ষ্য পূরণ করতে চেয়েছে। প্রথমত, সংসদে অভিজ্ঞ মুখ এনে উচ্চকক্ষে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। দ্বিতীয়ত, তৃণমূলের বর্তমান ও প্রাক্তন নেতাদের উদ্দেশে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া— রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা নেতাদের জন্য বিজেপির দরজা খোলা, এবং সেই দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও।
এক সময় তৃণমূলের হয়ে সংসদে সওয়াল করা এই তিন নেতাই এবার বিজেপির প্রতিনিধি হিসেবে উচ্চকক্ষে বসবেন। ফলে এই মনোনয়ন নিছক তিনটি আসনের প্রার্থী ঘোষণা নয়, বরং বাংলার বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। বৃহস্পতিবারের ঘটনাপ্রবাহ তাই স্পষ্ট করে দিল, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দলবদলের অভিঘাত এখন আর শুধু দলীয় সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রভাব পড়ছে সরাসরি দেশের সংসদীয় রাজনীতিতেও।




