অঙ্কন দাস
কথায় আছে, 'রথের টানে মা আসেন'। মা অর্থাৎ,দূর্গা। রথ মানে সর্বাঙ্গ ঈশ্বর। যার সমস্তটা জুড়ে ঈশ্বর বাস করে, তাকে শুধু রথ নয়; 'দেব-যান' আখ্যা দেওয়া যায়। একারনেই কবি বলেছেন--
'রথযাত্রা লোকারণ্য, মহা ধূমধাম/ভক্তরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
রথ ভাবে আমি দেব,পথ ভাবে আমি/মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসেন অন্তর্যামী।।
এই রথ জুড়ে রয়েছে ভারতের সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় আচার পালনের এক সুমহান ঐতিহ্য। 'নীলাচল ওড়িশা'র পর বাংলার রথের ইতিহাসই প্রাচীনতর।
বাংলায় গুপ্তিপাড়া,নবদ্বীপ এবং অন্যান্য জায়গার রথের থেকেও বেশী বিখ্যাত হুগলি জেলার মাহেশের রথযাত্রা। এই রথযাত্রা জুড়ে ছড়িয়ে আছে অনেক উপাখ্যান, অনেক ইতিহাস এবং অনেক ঐতিহাসিক মানুষের নাম।
আজ থেকে প্রায় ৬৩০ বছর আগে এক সাধক এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম ধ্রুবানন্দ। ভাগীরথীর জলে ভেসে আসা নিমকাঠ থেকে তৈরি হয় জগৎপ্রভু জগন্নাথের দারুব্রহ্ম মূর্তি।
'নয়নপথগামী'র করুণা ছড়িয়ে আছে 'শ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত' থেকে বঙ্কিমি উপন্যাস 'রাধারাণী' জুড়ে। এই রথ ইংরেজ আমলের তৎকালীন নির্মাতা 'মার্টিন বার্ন কোম্পানি' বানিয়েছিল; এবং এই রথের মূল নকশা সৃজন করেছিলেন প্রখ্যাত স্থাপত্যবিদ স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। যার অপর কিছু অমর স্থাপত্যের নিদর্শন বিড়লা জাদুঘর, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ।
মাহেশের স্নানযাত্রায় প্রভুর নানা বেশ বদল ঘটে--রাজবেশ, গজবেশ ইত্যাদি। নীলকন্ঠ পাখি উড়ে এসে খবর দেয়-- 'স্নানের সময় হল।' খিচুড়ি-অন্ন-পায়েস ভোগে উদরপূর্তি ঘটে জগৎপতি'র। তাঁর উদর ছড়িয়ে আছে সারা জগৎ; সকলের ক্ষুধা নিবারণ হলেই তাঁর সন্তুষ্টি ঘটে।
রথ শুরুর আগে নিলামের ডাক ওঠে--'কত টানে রথযাত্রা শেষ হবে!' বন্দুকের আওয়াজে শুরু হয় টান। লাখো কন্ঠে আওয়াজ ওঠে 'জয় জগন্নাথ'। চলে হরির লুঠ, কাঁসর-খোল-ঢাক-ঢোল বেজে ওঠে। খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি,প্রশাসনিক তৎপরতা--সরগরম হয়ে ওঠে প্রাচীন এই জনপদ।
তারপর?
তারপর রথের চাকা গড়ায়, যেমন 'কাল নিরবধি!' সেই চাকার কোনোটিতে লেখা পৌরাণিক আখ্যান,কোনোটিতে লেখা একটি হারিয়ে যাওয়া এগারো বছরের বালিকার গল্প, কোনোটিতে লেখা প্রভুকে নিজের হাতে ভোগ সেবা দিতে চেয়ে অপমানিত এক সাধকের ইতিহাস, আবার কোনোটি বলে চলে হাতের বালা বন্ধক দিয়ে জগন্নাথের মিষ্টি খাওয়ার অলৌকিক কথা!
রথের চাকার ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ ছাপিয়ে ভেসে আসে একটিই গান-- 'জগন্নাথস্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে'। আসুন, সেই গানে গলা মেলাই আমরাও।




