কলকাতা: দুর্গাপুজো, কালীপুজো পেরিয়ে উৎসবের মরসুমে আরও একটি বিশেষ দিন ভাইফোঁটা। ভাই-বোনের স্নেহ, ভালোবাসা আর নির্ভরতার সম্পর্ক উদ্যাপনের এই উৎসবের জন্য প্রতি বছরই অপেক্ষা করে থাকেন অনেকে। বোনের হাতে কপালে ফোঁটা নেওয়া, ভাইয়ের মঙ্গলকামনায় প্রার্থনা, সঙ্গে উপহার ও মিষ্টিমুখ—সব মিলিয়ে পারিবারিক আবেগের এক অনন্য দিন। তবে ২০২৬ সালে কবে পালিত হবে ভাইফোঁটা? কোন সময়ে ফোঁটা দেওয়াই শুভ? কী বলছে পঞ্জিকা?
কবে ভাইফোঁটা ২০২৬?
২০২৬ সালে ভাইফোঁটা পালিত হবে ১১ নভেম্বর, বুধবার। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। এই তিথি ১০ নভেম্বর, মঙ্গলবার দুপুর ২টোয় শুরু হয়ে ১১ নভেম্বর, বুধবার দুপুর ৩টে ৫৩ মিনিটে শেষ হবে। উদয়া তিথির হিসাব মেনে ১১ নভেম্বরই পালিত হবে ভাইফোঁটা।
ফোঁটা দেওয়ার শুভ সময় কখন?
১১ নভেম্বর ভাইফোঁটার দিন তিলক বা ফোঁটা দেওয়ার শুভ সময় দুপুর ১টা ১০ মিনিট থেকে ৩টে ২০ মিনিট পর্যন্ত। অর্থাৎ, ফোঁটা দেওয়ার জন্য হাতে থাকছে ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট। এই সময়ের মধ্যে বোনেরা ভাইয়ের কপালে তিলক পরিয়ে আরতি করতে পারেন। তবে পঞ্জিকার শুভ সময় স্থানভেদে কিছুটা বদলাতে পারে। তাই কলকাতা-সহ বিভিন্ন এলাকার ক্ষেত্রে স্থানীয় পঞ্জিকা বা পুরোহিতের পরামর্শ মেনে নেওয়া ভাল।
কেন পালিত হয় ভাইফোঁটা? কী রয়েছে পৌরাণিক কাহিনিতে?
ভাইফোঁটার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যমরাজ ও তাঁর বোন যমুনার কাহিনি। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে যমরাজ তাঁর বোন যমুনার বাড়িতে এসেছিলেন। ভাইকে কাছে পেয়ে আনন্দে আপ্লুত যমুনা তাঁর কপালে তিলক পরিয়ে আরতি করেন। ভাইয়ের জন্য নিজের হাতে খাবারও তৈরি করেছিলেন তিনি।
বোনের এই আন্তরিকতা ও আপ্যায়নে খুশি হয়ে যমরাজ যমুনাকে বর চাইতে বলেন। তখন যমুনা প্রার্থনা করেন, প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে যে ভাই বোনের কাছ থেকে তিলক গ্রহণ করবেন, তাঁর জীবন যেন সুখ, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ুতে ভরে ওঠে। যমরাজ সেই প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। সেই বিশ্বাস থেকেই দিনটি ‘যম দ্বিতীয়া’ নামেও পরিচিত। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভাইফোঁটার দিন বোনের হাত থেকে ফোঁটা নিলে ভাইয়ের অমঙ্গল দূর হয় এবং তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করা যায়।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা নামে পরিচিত
একই উৎসব দেশের বিভিন্ন রাজ্যে পালিত হয় ভিন্ন ভিন্ন নামে এবং আচার-অনুষ্ঠানে। পশ্চিমবঙ্গে এটি ভাইফোঁটা নামে পরিচিত। মহারাষ্ট্র ও গোয়ায় বলা হয় ‘ভাউ বীজ’। উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘ভাই দুজ’ বা ‘ভাইয়া দুজ’ নামেই পরিচিত এই উৎসব। নেপালে পালিত হয় ‘ভাই টিকা’।
নাম ও রীতির পার্থক্য থাকলেও উৎসবের মূল সুর একই—ভাই-বোনের সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় করা। কোথাও বোন ভাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা দেন, কোথাও রোলি ও চালের তিলক পরানো হয়। চলে আরতি, মিষ্টিমুখ এবং উপহার বিনিময়।
শুধু আচার নয়, সম্পর্ক উদ্যাপনের দিন
ভাইফোঁটা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, পারিবারিক সম্পর্ককে নতুন করে উদ্যাপনেরও উপলক্ষ। জীবনের ব্যস্ততায় দূরত্ব তৈরি হলেও এই দিন ভাই-বোনকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। বোন ভাইয়ের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও সাফল্য কামনা করেন। ভাইও বোনের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
উপহার বা আয়োজনের জাঁকজমক নয়, এই উৎসবের আসল গুরুত্ব লুকিয়ে রয়েছে পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস ও নির্ভরতার মধ্যেই। দীপাবলির উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই তাই ভাইফোঁটা নিয়ে প্রস্তুতি শুরু হবে ঘরে ঘরে। ২০২৬ সালের ১১ নভেম্বর সেই বিশেষ দিনেই ফের একবার উদ্যাপিত হবে ভাই-বোনের চিরন্তন সম্পর্ক।




