নয়াদিল্লি: দীপাবলির মুখে আকাশছোঁয়া বিমানভাড়া নিয়ে যাত্রীদের ক্ষোভ যখন তুঙ্গে, তখন সেই অভিযোগ শুনেই সংক্ষিপ্ত মন্তব্য সুপ্রিম কোর্টের। উৎসবের মরসুমে বিমানের টিকিটের দাম প্রায় ৭০০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে, এই অভিযোগ তুলে জরুরি শুনানির আর্জি জানানো হয়েছিল শীর্ষ আদালতে। কিন্তু সেই আবেদন শুনে বিচারপতি বিক্রম নাথের মন্তব্য, ‘‘বিমানে চড়বেন না। পরের মামলা।’’ এর পরেই অন্য মামলার শুনানিতে চলে যায় বেঞ্চ। ফলে উৎসবের মরসুমে বিমানভাড়ায় লাগাম টানার দাবিতে আপাতত কোনও স্বস্তি পেলেন না যাত্রীরা।
সোমবার বিচারপতি বিক্রম নাথ, বিচারপতি সন্দীপ মেহতা এবং বিচারপতি অপারেশ কুমার সিংহের বেঞ্চে বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে শুনানির জন্য তোলেন এক আইনজীবী। তাঁর বক্তব্য, বিমানভাড়া প্রায় ৭০০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। বিমানযাত্রা এখন অনেকের কাছেই অত্যাবশ্যক পরিষেবা। অথচ উৎসবের সময়ে বিমান সংস্থাগুলি যে হারে ভাড়া বাড়াচ্ছে, তা সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত সাম্যের অধিকারের পরিপন্থী। জবাবে বিচারপতি নাথ বলেন, ‘‘বিমানে চড়বেন না। পরের মামলা।’’ আদালত ওই আবেদনটি জরুরি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করতে রাজি হয়নি।
আবেদনকারীর অভিযোগ, দীপাবলি ও ছটপুজোর মতো উৎসবের সময়ে দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রুটে বিমানভাড়া স্বাভাবিকের তুলনায় দুই থেকে সাত গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে বাড়ি ফেরার তাগিদে যাত্রীরা কার্যত বেশি দাম দিয়ে টিকিট কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। আবেদনে দাবি করা হয়েছে, দিল্লি-কলকাতা রুটে সাধারণ সময়ে যে টিকিটের দাম ১০ থেকে ১১ হাজার টাকার মধ্যে থাকে, ৬ নভেম্বরের যাত্রার জন্য সেই টিকিটের দাম বেড়ে ৭৮ হাজার ৬৯৪ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। একই ভাবে বেঙ্গালুরু-দিল্লি, মুম্বই-দিল্লি-সহ একাধিক রুটে অস্বাভাবিক ভাড়াবৃদ্ধির উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে।
একই রুটে, একই দিনে, এমনকি একই বিমান সংস্থার উড়ানের ক্ষেত্রেও টিকিটের দামে বিপুল ফারাক কেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন আবেদনকারী। তাঁর বক্তব্য, ৬ নভেম্বর বেঙ্গালুরু থেকে দিল্লিগামী একটি বিমানের সকাল ৫টার উড়ানের ভাড়া যেখানে প্রায় ১৫ হাজার ৯০০ টাকা, সেখানে একই রুটে বিকেল ৩টে ৪৫ মিনিটের উড়ানের ভাড়া ৪০ হাজার টাকারও বেশি। একই দিনে মুম্বই-দিল্লি এবং দিল্লি-মুম্বই রুটেও কয়েক গুণ ভাড়াবৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে।
বিমান সংস্থাগুলি সাধারণত বিমান জ্বালানির দাম এবং পরিচালন খরচ বৃদ্ধিকে ভাড়াবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখায়। কিন্তু আবেদনকারীর যুক্তি, একই রুটে একই দিনে চলা বিমানগুলির জ্বালানি খরচে এমন কোনও পার্থক্য থাকে না, যা টিকিটের দামে এত বিপুল ব্যবধানের ব্যাখ্যা দিতে পারে। তাঁর অভিযোগ, চাহিদার সুযোগ নিয়ে অ্যালগরিদম-নির্ভর ভাড়া নির্ধারণের মাধ্যমে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। উৎসবের সময়ে যাত্রীদের অসহায়তার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিমানভাড়া নিয়ন্ত্রণের দাবিতে অবশ্য সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা আগে থেকেই বিচারাধীন। সমাজকর্মী এস লক্ষ্মীনারায়ণ ওই মামলা করেছেন। তাঁর আবেদনে বিমানভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে একটি স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, বিমান সংস্থাগুলির ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানো এবং অতিরিক্ত পরিষেবা বাবদ নানা চার্জ আদায়ের উপর নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরির আর্জিও রয়েছে।
উৎসবের মরসুমে বিমানভাড়ার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে এর আগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শীর্ষ আদালত। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মহাকুম্ভ ও অন্যান্য উৎসবের সময়ে টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে বিমান সংস্থাগুলির এই প্রবণতাকে ‘শোষণ’ বলে মন্তব্য করেছিল বেঞ্চ। ভাড়ার এমন অনিশ্চিত ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে কেন্দ্র এবং অসামরিক বিমান পরিবহণের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ-র জবাবও চেয়েছিল আদালত। মে মাসের শুনানিতেও একই রুটে একই দিনে বিভিন্ন বিমান সংস্থার ভাড়ার বিপুল ফারাক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এ দিকে, বিমান পরিষেবা নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধি তৈরির পথে এগিয়েছে কেন্দ্র। ২০২৪ সালের ভারতীয় বায়ুযান অধিনিয়মের আওতায় তৈরি ‘ভারতীয় বায়ুযান নিয়ম, ২০২৬’ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। নতুন নিয়ম কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে বিমানভাড়া নিয়ে বিমান সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে কেন্দ্রের। পাশাপাশি, পরিচালন খরচ-সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে ভাড়া নির্ধারণ এবং ভাড়ার তথ্য ডিজিসিএ-র কাছে জমা দেওয়ার বিধানও রয়েছে।
তবে নতুন নিয়ম কার্যকর হতে এখনও দু’মাসেরও বেশি সময় বাকি। তার আগে দীপাবলি ও বছরের শেষের উৎসবের মরসুমে ভাড়াবৃদ্ধি ঠেকাতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা চেয়েছেন আবেদনকারী। অর্থনৈতিক শ্রেণির যাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে চেক-ইন ব্যাগেজের পুরনো ২৫ কেজি সীমা ফিরিয়ে আনার দাবিও জানানো হয়েছে। বর্তমানে সেই সীমা কমিয়ে ১৫ কেজি করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আকাশছোঁয়া ভাড়া, শেষ মুহূর্তে টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া এবং লাগেজের সীমা কমানো—সব মিলিয়ে বিমানযাত্রীদের অসন্তোষ বাড়ছে। এক দিকে বিমান সংস্থাগুলির ব্যবসায়িক যুক্তি, অন্য দিকে যাত্রীদের স্বার্থে ভাড়া নিয়ন্ত্রণের দাবি। এই টানাপড়েনের মধ্যেই আগামী ১৬ নভেম্বর বিমানভাড়া সংক্রান্ত মূল জনস্বার্থ মামলার পরবর্তী শুনানি সুপ্রিম কোর্টে। কেন্দ্রের নতুন বিধি এবং বিমানভাড়ার অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ করা হয়, এখন সেদিকেই নজর।




