নিউজ ডেস্ক: কাশ্মীরের উপত্যকা থেকে শুরু করে মণিপুরের জাতিদাঙ্গা কিংবা মাওবাদীদের শেষ শক্তিকাঁটা দেশের প্রতিটি বিপজ্জনক অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টেই তাঁদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই সিআরপিএফ-এর খাতার পাতায় এবার যা ঘটল, তাকে আধুনিক সামরিক ইতিহাসে বিরল এক মোড় বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। বিগত ৪৭ বছরের মধ্যে এই প্রথম টানা ১২ মাস কোনো অভিযানে একজন জওয়ানেরও প্রাণহানি হয়নি কেন্দ্রীয় এই আধা-সামরিক বাহিনীতে।
২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর শেষবার কর্তব্যরত অবস্থায় মৃত্যু হয়েছিল বাহিনীর এক সদস্যের। তারপর থেকে পুরো এক বছর সেই সংখ্যাটি শূন্যতেই আটকে রয়েছে। সোমবার সমাজমাধ্যমে এই তথ্য ভাগ করে নিয়ে সিআরপিএফ-এর মহানির্দেশক জিপি সিং বিষয়টিকে বাহিনীর ইতিহাসে একটি ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ঘটনাচক্রে, জিপি সিং যখন অসম পুলিশের ডিজি ছিলেন, ২০২৩ সালে সেখানেও বাহিনীর প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে এনেছিলেন তিনি। আর সিআরপিএফ-এর ইতিহাসে এটি ষষ্ঠ নজির,যার শেষ নজিরটি গড়ে উঠেছিল ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সালের মাঝে, টানা ২৪ মাস।
অথচ এই এক বছর কিন্তু শান্তিতে কাটেনি। একদিকে মণিপুরের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মাঝখানে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো, অন্যদিকে জম্মু-কাশ্মীরে সন্ত্রাসবিরোধী লাগাতার অভিযান। সবথেকে বড় লড়াইটা ছিল মাওবাদী ফ্রন্টে যেখানে চূড়ান্ত পর্যায়ের আঘাত হেনে শীর্ষ নেতৃত্বকে খতম করা হয়েছে এবং ২০২৬ সালের মার্চে দেশকে নকশাল-মুক্ত ঘোষণা করা হয়। কারেগাট্টালু পাহাড়ের ‘অপারেশন ব্ল্যাক ফরেস্ট’-এ ২১ জন মাওবাদী খতম হলেও জওয়ানদের গায়ে আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি। ১৯৪৭ সাল থেকে হিসাব করলে বাহিনীর ২,২৬৮ জন সদস্য শহিদ হয়েছেন, গড়ে প্রতি বছর প্রায় ২৮ জনেরও বেশি। এমনকি ২০১০ সালে বস্তারের এক হামলায় ৭৫ জন জওয়ান সহ এক বছরে সর্বোচ্চ ১৪৩ জনের মৃত্যুর স্মৃতি আজও টাটকা। সেখান থেকে এই রূপান্তর কীভাবে সম্ভব হলো?
বাহিনীর অন্দরের খবর, বিষয়টি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়,এর পেছনে রয়েছে রণকৌশলের আমূল সংস্কার। প্রথমত, নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য ও আধুনিক প্রতিরক্ষামূলক সাজসরঞ্জামের পাশাপাশি অপারেশনে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ বেশি জওয়ান নামানোর সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয়ত, কোনো সাধারণ প্রশাসনিক যাতায়াতকেও আর হাল্কাভাবে না নিয়ে অভিযানের সমান নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় খেলাটা ঘুরেছে চিকিৎসার ক্ষেত্রে। পুরনো মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছিল, ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর চেয়ে আহত হওয়ার কয়েক দিন পর চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর হার প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সহায়তায় এখন পরিস্থিতি বদলেছে। প্রত্যন্ত জঙ্গলেও কেউ সামান্য জখম হলে আর ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে না,জরুরি ভিত্তিতে ‘এয়ার-অ্যাম্বুল্যান্স’ উড়িয়ে দ্রুত উন্নত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে তাঁদের। কৌশলগত সতর্কতা আর দ্রুত উদ্ধারকাজের এই মেলবন্ধনই এবার বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়ানদের অক্ষত অবস্থায় ঘরে ফিরিয়ে আনছে।




