কোচি: বয়স ১০০। জীবনের এই প্রান্তে এসে অনেকেই কাজ থেকে অবসর নিয়ে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে চান। কিন্তু পি বি মেননের অভিধানে অবসর শব্দটির যেন কোনও জায়গাই নেই। এক হাতে মামলার ফাইল, অন্য হাতে আইনের বই—শতবর্ষেও আদালতে যাতায়াতের অভ্যাসে ছেদ পড়েনি কেরলের পালাক্কাডের এই প্রবীণ আইনজীবীর। প্রায় আট দশক ধরে পেশার সঙ্গে যুক্ত তিনি। আদালতের কাঠগড়া, সওয়াল-জবাব আর মক্কেলের আস্থাই তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শনিবার, ১০ অক্টোবর, শতবর্ষে পা দিয়েছেন পি বি মেনন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ইতিমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। ২০২৩ সালে ৭৩ বছর ৬০ দিন ধরে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার নজির গড়ে বিশ্বের দীর্ঘতম সময় ধরে পেশায় যুক্ত আইনজীবীর স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি। সেই সময়ে তাঁর বয়স ছিল ৯৮ বছর। তার পরেও থেমে থাকেননি মেনন। একের পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও আদালতের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেছেন তিনি।
শততম জন্মদিনে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন প্রবীণ আইনজীবী। তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের হয়ে আইনি লড়াই চালানোর জন্য মেননের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, কয়েক দশক ধরে মানুষের সেবায় তাঁর নিষ্ঠা ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা আগামী প্রজন্মের আইনজীবীদের অনুপ্রাণিত করবে। শতবর্ষের এই মাইলফলক তাই শুধু ব্যক্তিগত উদ্যাপন নয়, আইনি পেশার প্রতি এক অসাধারণ দায়বদ্ধতার স্বীকৃতিও।
১৯৪৭ সালে পালাক্কাডের গভর্নমেন্ট ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক হন মেনন। তার পর চেন্নাইয়ের মাদ্রাজ ল কলেজে আইন নিয়ে পড়াশোনা। কর্মজীবনের শুরু মাদ্রাজ হাইকোর্টে। সেখানে দু’বছর কাজ করার পর বাবা-মায়ের অনুরোধে নিজের শহর পালাক্কাডে ফিরে আসেন। সেখানেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁর দীর্ঘ আইনজীবী-জীবন।
তবে তাঁর পেশাগত জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল একটি ঘটনা। কেরিয়ারের শুরুর দিকে এক ফৌজদারি মামলায় সওয়াল করার জন্য তাঁকে কোচির একটি নিম্ন আদালতে পাঠিয়েছিলেন তাঁর সিনিয়র। মামলায় জেতার পর এক প্রবীণ বিচারক তাঁকে নিজের কক্ষে ডেকে পাঠান। বিচারকের পরামর্শ ছিল, মেননের উচিত দেওয়ানি মামলায় মনোনিবেশ করা। সেই পরামর্শই জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিশা হয়ে ওঠে তাঁর কাছে। পরে দেওয়ানি আইনকেই নিজের পেশার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন তিনি।
মেননের মতে, কোনও মামলার গুরুত্ব নির্ভর করে না তার আকার বা প্রচারের উপর। প্রতিটি মামলাতেই মক্কেলের ভাগ্য, অধিকার ও ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। তাই কোনও মামলাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর কাজের ধরনেও সেই দর্শনের ছাপ স্পষ্ট—মামলার খুঁটিনাটি ভালো করে বোঝা, যুক্তি সাজানো এবং বিপক্ষের সম্ভাব্য প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত থাকা। দীর্ঘ বক্তৃতা বা জটিল ভাষার চেয়ে বিষয়টির উপর গভীর দখল এবং সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট যুক্তিকেই বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর সহকর্মীদের কাছেও মেনন শুধু দীর্ঘ কর্মজীবনের জন্য স্মরণীয় নন। প্রাক্তন ডেপুটি ডিরেক্টর অব প্রসিকিউশন পি প্রেম নাথের মতে, তিনি যেন আইনি পেশারই একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর কাছ থেকে আজকের তরুণ আইনজীবীদের শেখার অনেক কিছু রয়েছে। আইনজীবী তথা বিজেপির কেরল শাখার কোষাধ্যক্ষ ই কৃষ্ণদাসও মেননের নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের প্রশংসা করেছেন।
পালাক্কাডের পুথুর এলাকায় তাঁর বাড়ি ‘রোজ ল্যান্ড’ দীর্ঘদিন ধরে আইনজীবী ও মক্কেলদের আনাগোনার জায়গা। নতুন প্রজন্মের আইনজীবীরা তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে আসেন। নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে কখনও পিছপা হন না তিনি। এক সময় নিজের আইনের বইয়ের সংগ্রহও বার অ্যাসোসিয়েশনকে দান করেছেন। তরুণ আইনজীবীদের জন্য আইনি কুইজের আয়োজন করা এবং তাঁদের উৎসাহিত করাও তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য দিক।
মেননের মেয়ে সুভদ্রা মুরলীধরনের কথায়, প্রতিটি মামলাকেই তাঁর বাবা সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। মক্কেলের স্বার্থ রক্ষা এবং ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে কাজ করাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মেনন নিজেও মনে করেন, একজন আইনজীবীর সাফল্য শুধু কত বছর তিনি আদালতে কাজ করলেন বা কত মামলা লড়লেন, তার উপর নির্ভর করে না। মক্কেল তাঁকে কতটা বিশ্বাস করেন, তাঁর পরামর্শকে কতটা নির্ভরযোগ্য মনে করেন, সেটাই আসল প্রাপ্তি।
তাঁর সমসাময়িক অনেকেই বিচারকের আসনে বসেছেন। কিন্তু মেনন বেছে নিয়েছেন আইনজীবী হিসেবেই থেকে যাওয়ার পথ। সুস্থ থাকা পর্যন্ত মক্কেলের হয়ে আদালতে দাঁড়াতে চান তিনি। এক শতাব্দীর জীবনে পেশাগত অভিজ্ঞতা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে আইনের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা।
শতবর্ষে পৌঁছেও তাই কাজ থামানোর কথা ভাবছেন না পি বি মেনন। তাঁর কর্মজীবনের দৈর্ঘ্য হয়তো রেকর্ডের পাতায় লেখা থাকবে, কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার লুকিয়ে রয়েছে অন্য জায়গায়—প্রতিটি মামলাকে গুরুত্ব দেওয়া, সৎ পরামর্শ দেওয়া এবং মানুষের বিশ্বাস অর্জন করার মধ্যে। আদালতের সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্কই প্রমাণ করে, কারও কারও কাছে কাজ শুধু জীবিকা নয়, আজীবনের সাধনা।
