JAZZBAAT 24 বাংলা ডেস্ক: দেশের তরুণ প্রজন্মের সামনে যে কর্মসংস্থানের সঙ্কট ক্রমশ গভীর হচ্ছে, তা-ই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক রিপোর্ট। ‘রিইম্যাজিনিং স্কিলিং ফর বিকশিত ভারত@2047’ শীর্ষক রিপোর্টে উঠে এসেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি আনুমানিক ৮.৭ কোটি তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান অথবা কোনও প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নন। অর্থাৎ, সংখ্যাটি প্রায় ৯ কোটি। ২০২১ সালের জাতীয় নমুনা সমীক্ষার ৭৮তম দফার তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে।
আরও উদ্বেগের ছবি উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে। কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর যে কাজের সঙ্গে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সরাসরি সম্পর্ক থাকবে, সেই ধরনের কর্মসংস্থান পাচ্ছেন মাত্র ৮.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ, ডিগ্রি অর্জনের পরেও বিপুল সংখ্যক তরুণকে হয় যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কাজ করতে হচ্ছে, নয়তো কর্মসংস্থানের সন্ধানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নীতি আয়োগের বক্তব্য, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর ‘স্কিল মিসম্যাচ’।
রিপোর্টে ‘NEET’ বলতে বোঝানো হয়েছে সেই তরুণদের, যাঁরা ‘Not in Education, Employment or Training’—অর্থাৎ পড়াশোনা, চাকরি কিংবা প্রশিক্ষণ, কোনও ক্ষেত্রেই নেই। এই বিপুল সংখ্যক তরুণের একটি বড় অংশ আর্থিক সমস্যার কারণে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি অতিরিক্ত দক্ষতা অর্জনের প্রশিক্ষণ নিতে পারেন না। ফলে ডিগ্রি শেষ করার পরেও শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতি থেকে যায়।
সমস্যার কেন্দ্রেই রয়েছে প্রচলিত ডিগ্রি-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা। নীতি আয়োগের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, দেশের ৩.৪ কোটি পড়ুয়া স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১.১৩ কোটি পড়ুয়া বিএ পড়ছেন। বিএ, বিএসসি এবং বিকম মিলিয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি। অথচ এই সাধারণ ডিগ্রিগুলির সঙ্গে সরাসরি চাকরির বাজারের যোগ অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। অনেক পড়ুয়ার কাছে ডিগ্রি হয়ে উঠছে মূলত সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসার যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যম।
এই পরিস্থিতিই সরকারি চাকরির প্রতি অস্বাভাবিক নির্ভরতার অন্যতম কারণ বলে মনে করছে রিপোর্ট। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে মাত্র ৫৫ হাজার সরকারি পদের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ১.৮৬ কোটি। অর্থাৎ, একটি পদের পিছনে প্রতিযোগিতা ছিল কয়েকশো প্রার্থীর।
কিন্তু সমস্যা শুধু চাকরির সংখ্যা নয়। শিক্ষাব্যবস্থার ভিতরেও রয়েছে বড় ফাঁক। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৮০ শতাংশ পড়ুয়া তাঁদের পড়াশোনায় ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা এবং শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখেছেন। ৩৪ শতাংশ পড়ুয়ার মতে, দক্ষতার ঘাটতি তাঁদের অন্যতম প্রধান সমস্যা; ১৮ শতাংশের অভিযোগ, চাকরির সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতির সুযোগ যথেষ্ট নেই। ফলে পরীক্ষার খাতায় ভাল ফল করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় বহু তরুণ পিছিয়ে পড়ছেন।
কী ভাবে এই ফাঁক ভরাট করা যায়, তারও পথ দেখিয়েছে নীতি আয়োগ। স্কুলস্তর থেকেই কর্মমুখী দক্ষতার প্রশিক্ষণ চালু করার প্রস্তাব রয়েছে রিপোর্টে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ কর্মসংস্থান ও উদ্যোগের দক্ষতা শেখানোর পাশাপাশি নবম শ্রেণি থেকে কাঠামোবদ্ধ ‘কৌশল ট্র্যাক’ চালুর কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় ও জাতীয় শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে এই প্রশিক্ষণকে সাজানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে নীতি আয়োগ। কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগে বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি হলে তরুণদের চাকরিযোগ্যতা বাড়বে। তবে শুধু নামমাত্র ইন্টার্নশিপ নয়, বাস্তবে কাজ শেখার সুযোগ তৈরি করাই জরুরি বলে রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নীতি আয়োগের রিপোর্টের বার্তা স্পষ্ট—দেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটলেও সেই শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সেতু এখনও দুর্বল। বিপুল সংখ্যক তরুণ ডিগ্রি হাতে নিয়ে বেরোচ্ছেন, কিন্তু সেই ডিগ্রি তাঁদের কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্য পূরণ করতে হলে তাই শুধু কত জন কলেজে ঢুকলেন, তার হিসাব নয়; কত জন পড়াশোনা শেষ করে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পেলেন, সেই প্রশ্নটিই হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।