নিউজ ডেস্ক: মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরের প্রত্যন্ত এক পাহাড়ি জঙ্গল। নেই বিদ্যুৎ, নেই যাতায়াতের উপযুক্ত রাস্তা, নেই কোনও যানবাহনের সুবিধা। অথচ প্রতিদিন ঠিক সময়েই সেখানে পৌঁছে যান ৫৫ বছর বয়সী শিক্ষক জীবন মিথারি। কারণ, তার অপেক্ষায় থাকে একজন পড়ুয়া। ২০১৩ সাল থেকে কাওয়লটেক ধাঙ্গারওয়াড়ার জেলা পরিষদ বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন তিনি। স্কুলে পৌঁছতে জঙ্গলের প্রবেশপথের পর তাকে প্রায় আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা পায়ে হাঁটতে হয়।
যাওয়া-আসা মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫ কিলোমিটার পথ। একসময় শিক্ষক সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এই মানুষটি নিজের ইচ্ছাতেই বেছে নিয়েছিলেন দুর্গম বিদ্যালয়ের দায়িত্ব। কারণ তার কাছে একজন শিশুর পড়াশোনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পড়ুয়ার সংখ্যা কমে গেলেও শিক্ষকের দায়িত্ব যে কমে যায় না, জীবন মিথারি প্রতিদিন নিজের কাজের মাধ্যমে সেটাই প্রমাণ করে চলেছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত ১৩ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন তিনি।
ঐ বিদ্যালয়ে ২৬ জুলাই ২০১৩ সালে যোগ দেন জীবন। তার বাড়ি থেকে যাত্রার একটি বড় অংশ মোটরবাইকে পেরোলেও জঙ্গলের প্রবেশপথের পর শুরু হয় আসল লড়াই। এই পথের ভয় শুধু দুর্গমতার জন্য নয়। পশ্চিমঘাটের এই অরণ্যাঞ্চলে গৌর বা ভারতীয় বুনো মহিষ, চিতাবাঘ, বুনো শুয়োর, বন্য কুকুর, স্লথ ভালুক এবং বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত সাপের দেখা মেলে। একবার গৌরের পাল পথ আটকে দেওয়ায় জীবনকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আবার গ্রামের কাছাকাছি একটি গবাদি পশুকে চিতাবাঘ মেরে ফেলার পর বন দফতর এলাকায় নজরদারি বাড়ায়। বসানো ক্যামেরাতেও চিতাবাঘের উপস্থিতি ধরা পড়ে।
একসময় কাওয়লটেক ধাঙ্গারওয়াড়া এমন জনশূন্য ছিল না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, একসময় এই অঞ্চলে প্রায় ৭০ থেকে ১০০টি পরিবার বসবাস করত। কিন্তু ২০০০ সালের পর জীবিকার সন্ধানে বহু পরিবার কোলহাপুর শহর এবং আশপাশের এলাকায় চলে যেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায় বসতি। বর্তমানে কাওয়লটেক ধাঙ্গারওয়াড়ায় মাত্র কয়েকটি পরিবার রয়েছে। মানুষের সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে বিদ্যালয়ের পড়ুয়ার সংখ্যাও।
বর্তমানে বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী স্বরা একমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত পড়ুয়া। তবে স্কুলে শুধু স্বরাই আসে না। তার পাঁচ বছরের ছোট বোনও দিদির সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে বসে পড়াশোনা করে। বয়সের কারণে এখনও তার আনুষ্ঠানিক ভর্তি হয়নি। এলাকায় অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রও নেই। ফলে শিক্ষকের কাছে এই ছোট্ট পড়ুয়ার উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
জীবন জানিয়েছেন, এই পথে চলার সময় তিনিও ভয় পান। বন্যপ্রাণীর এলাকায় একা হাঁটার ঝুঁকি তিনি জানেন। কখনও গান করেন, কখনও শব্দ করেন, যাতে আশপাশের প্রাণীরা তার উপস্থিতি বুঝতে পারে। কিন্তু ১৩ বছর ধরে একই পথ চলতে চলতে সেই ভয়ও তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে। শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যে পথ পেরোন, সেটিই যেন তার কাজের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জীবন মিথারির অবসর নেওয়ার কথা ২০২৯ সালের মে মাসে। তার আগে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি রয়েছে—বিদ্যালয়ের চারপাশে একটি সুরক্ষিত সীমানা প্রাচীর তৈরি করা। কারণ একটি প্রত্যন্ত স্কুলে শিক্ষক পৌঁছে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেখানে থাকা শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রতিদিনের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার জঙ্গলপথ তাই শুধু একজন শিক্ষকের যাতায়াতের রাস্তা নয়, প্রত্যন্ত ভারতের একটি শিশুর শিক্ষার অধিকার ধরে রাখার পথ কারণ প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরাও সমানভাবে শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার অধিকার রাখে।