নিউজ ডেস্ক: সোশ্যাল মিডিয়ার ‘মধুর স্মৃতি’র আড়ালে অনাহারের রূঢ় বাস্তবতা। বৃষ্টির দিনে একমুঠো অন্নের প্রতীক্ষায় ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা। সামাজিক মাধ্যমের টাইমলাইনে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে একটি দৃশ্য, যেখানে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছে একদল শিশু। ক্যাপশনে রোমন্থন করা হচ্ছে ফেলে আসা সোনালি শৈশবের ‘আনন্দ’ আর ‘শান্তিময় জীবনের’ কথা কিন্তু ভিডিওটি নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করলেই তথাকথিত ভার্চুয়াল আবেগের এই রঙিন চশমা ভেঙে বেরিয়ে আসে এক চরম অপ্রিয় সত্য। যা কিছু মানুষের কাছে ‘বৃষ্টিভেজা শৈশবের নস্টালজিয়া’ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে।
কিন্তু ভিডিওতে দেখা যাওয়া শিশু গুলির কাছে বাস্তবে তা আনন্দ নয় উল্টে পেটের তাগিদে খোলা আকাশের নিচে খাদ্য সংকটের করুণ লড়াই। যেখানে প্রবল বৃষ্টিতে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতেও পেটে খিদে মেটানোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে লাইন দিয়ে। এ যেন আমাদের সমাজে এক নির্মম দিক। ভিডিওটি দেখলেই বোঝা যায় বৃষ্টি সবার জন্য রোমান্টিক বা আবেগের হয় না।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, কাদামাখা কাঁচা রাস্তায় অবিরাম বৃষ্টিতে ভিজছে একদল কচি মুখ। অধিকাংশেরই গায়ে মলিন, ভেজা পোশাক, পা দুটো সম্পূর্ণ খালি। মাথায় কোনো ছাতা নেই,বৃষ্টির ফোঁটা থেকে বাঁচতে অনেকে তাদের হাতের প্লাস্টিকের ফাঁকা থালা বা বাটিটিকেই উল্টে মাথার ওপর ধরে রাখার চেষ্টা করছে। লাইনের শেষ মাথায় দেখা মেলে একটি খোলা চুলার, যেখানে বড় হাঁড়িতে রান্না চলছে এবং খাদ্য বিতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সামান্য খাবারের আশায় চরম বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও তারা দীর্ঘ লাইনে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছে। অথচ ভিডিওটির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া বিবরণীতে বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে একে ‘অভাবহীন শৈশবের সুখস্মৃতি’ বলে দাবি করা হয়েছে। আধুনিক জীবনধারার ক্লান্তির মাঝে দাঁড়িয়ে অনেকে এটিকে অতি-রোমান্টিক রূপ দিয়ে লাইক ও প্রতিক্রিয়ার উপকরণ বানাচ্ছেন।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল ও দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই বেঁচে থাকার লড়াইকে ‘রোমান্টিসাইজ’ করা চরম অসংবেদনশীলতা। অভাব যখন কাউকে বৃষ্টিতে ভিজে একমুঠো ভাতের আশায় দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন তা কখনো আনন্দের শৈশব হতে পারে না। ক্ষুধা আর পুষ্টিহীনতার এই নীরব হাহাকারকে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় লাইক কুড়ানোর সস্তা আবেগ বানানোর প্রবণতা মূলত মূল সমস্যাটিকে আড়াল করে দেয়। ভিডিওর ওই খালি থালাগুলো কোনো খেলার সামগ্রী নয়, তা বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা কোটি শিশুর বঞ্চনার প্রতীক।
