কলকাতার সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত ঠিকানা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস। আমাদের মতো থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে অ্যাকাডেমি শুধু একটি ভবন নয় - মঞ্চ, আলো, গ্রিনরুম, দর্শকের হাততালি আর বহু শিল্পীর স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা জায়গা। অথচ কয়েক দিন ধরে সেখানে নাটক বা প্রদর্শনীর থেকেও বেশি আলোচনা হচ্ছে টিকিট কাউন্টারের রং নিয়ে। কখনও গেরুয়া, তার উপর সাদা, আবার পরের দিন ফের গেরুয়া।
গেরুয়া রং করা নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন নাট্য ও সংস্কৃতি জগতের একাংশ। প্রতিবাদে কাউন্টারটি সাদা করে দেওয়া হয়। পরে বিজেপি কর্মীদের একাংশ ফের সেটি গেরুয়া করেন। সেখানে উপস্থিত অভিনেতা তথা বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ । তার বক্তব্য - গেরুয়া শুধু কোনও রাজনৈতিক দলের রং নয়, ভারতীয় সংস্কৃতি ও ত্যাগেরও প্রতীক।
কিন্তু একজন থিয়েটারকর্মী হিসেবে আমার প্রশ্ন—শিল্পের গায়ে আদৌ কোনও দলীয় রং লাগানোর প্রয়োজন আছে কি?
অ্যাকাডেমির ইতিহাসও আমাদের সেই প্রশ্নটাই মনে করিয়ে দেয়। ১৯৩৩ সালে পথচলা শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়ের নাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ স্নেহধন্যা রাণু তাঁকে ‘ভানুদাদা’ বলে ডাকতেন। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও উদ্যোগ অ্যাকাডেমিকে কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল।
যে জায়গা এত শিল্পী, নাট্যকর্মী ও শিল্পপ্রেমীর স্মৃতি বহন করছে, সেই জায়গার পরিচয় যদি কোনও রাজনৈতিক রঙের মধ্যে আটকে যায়, একজন শিল্পী হিসেবে সেটা আমার কাছে অস্বস্তির।
আমি গেরুয়া, সাদা, সবুজ বা লাল কোনও রঙের বিরোধী নই। রঙের নিজের কোনও রাজনীতি নেই। সমস্যা তখনই, যখন সেই রং দিয়ে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা হয়।
রাজনীতি নিয়ে শিল্প কথা বলবে, প্রতিবাদ করবে, প্রশ্ন তুলবে সেটাই শিল্পের স্বাধীনতা। কিন্তু শিল্পের মধ্যে রাজনীতি থাকা আর শিল্পের জায়গাকে কোনও রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের অংশ করে দেওয়া এক কথা নয়।
অ্যাকাডেমিতে একজন মানুষ নাটক দেখতে এলে তাঁর যেন মনে না হয়, তিনি কোনও বিশেষ রাজনৈতিক মতের জায়গায় এসেছেন। তাঁর মনে হওয়া উচিত এই জায়গাটা আমারও, কারণ আমি শিল্পকে ভালোবাসি।
আমার কাছে অ্যাকাডেমির আসল রং তার রং মঞ্চের আলোয়, অভিনেতার ঘামে, চিত্রশিল্পীর তুলিতে আর দর্শকের হাততালিতে।
টিকিট কাউন্টার আগামী দিনে কোন রং হবে, সেটা সময় বলবে। কিন্তু একটা জায়গা অন্তত রাজনৈতিক রঙের বাইরে থাকুক -- শিল্পীর স্বাধীনতার জায়গাটা।
রাজনীতির নিজের মঞ্চ অনেক আছে।
শিল্পের মঞ্চটুকু শিল্পীদেরই থাকতে দেওয়া হোক।