নিউজ ডেস্ক: কলকাতায় দুর্গাপুজোকে ঘিরে কথিত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে বড় পদক্ষেপ করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ED। মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে প্রাক্তন রাজ্য মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের কসবার বাড়ি-সহ কলকাতার মোট ১৫টি জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। তদন্তের আওতায় রয়েছেন ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর সঙ্গে যুক্ত বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন এমন কয়েকজন ব্যক্তিও। বিষয়টি এখন আর শুধু অভিযোগের পর্যায়ে নেই, PMLA-র অধীনে আর্থিক লেনদেন ও সম্ভাব্য মানি ট্রেল খতিয়ে দেখছে ED।
অভিযোগের সূত্রপাত Mahanirban Road Mass Art Society নামে একটি সংগঠনকে ঘিরে। ২০২২ সালে তৈরি হওয়া এই সংগঠন দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও আর্ট-প্রিভিউ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিল। অভিযোগকারী জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের দাবি, সংগঠনটির সঙ্গে UNESCO-র আনুষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব রয়েছে, এমন দাবি করা হয়েছিল এবং UNESCO-র নাম ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু দুর্গাপুজোর জন্য বিশেষ আয়োজন ও প্রবেশব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই কলকাতা পুলিশে FIR দায়ের হয়েছিল।
তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, UNESCO-র সঙ্গে আসলে কী ধরনের সম্পর্ক ছিল ওই সংগঠনের? কারণ UNESCO-র সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালে ‘Durga Puja in Kolkata’ মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের Representative List-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ দুর্গাপুজোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাস্তব। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট বেসরকারি সংগঠন UNESCO-র সঙ্গে অংশীদার এমন দাবি আলাদা বিষয় এবং তার জন্য নির্দিষ্ট অনুমোদন বা চুক্তির প্রমাণ প্রয়োজন।
এখানেই সামনে আসে ২০২৫ সালের ঘটনাও। সে বছর কলকাতায় একটি Durga Puja Art Preview Show-তে ২৪টি পুজো অংশ নিয়েছিল। অনুষ্ঠানটির সঙ্গে UNESCO-র দক্ষিণ এশিয়া দফতরের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন এবং UNESCO ও IIT Kharagpur-এর সহযোগিতায় দুর্গাপুজোয় accessibility বা সকলের জন্য সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার একটি কর্মসূচিও চালু হয়েছিল। ফলে UNESCO-র নাম ও দুর্গাপুজোর ২৪টি প্যান্ডেল এই দুই বিষয়কে ঘিরে পরবর্তী অভিযোগের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।
অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্য, ২৪টি প্যান্ডেলকে বিশেষভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে এবং সেই পুজোগুলিতে প্রবেশের জন্য টিকিট ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। তাঁর দাবি, বিষয়টি UNESCO-কে জানানো হলে সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয় যে কোনও নির্দিষ্ট সংস্থার সঙ্গে এমন চুক্তি করা হয়নি এবং ২৪টি প্যান্ডেলকে UNESCO-র পক্ষ থেকে ওইভাবে নির্বাচিতও করা হয়নি। এই অভিযোগের পরই কলকাতা পুলিশের কাছে FIR করা হয়।
তবে ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর পক্ষের বক্তব্যও এই ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ সামনে আসার পর প্রাক্তন মন্ত্রী দাবি করেছিলেন, তিনি ওই অভিযোগকারীর নামও জানতেন না এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভিত্তিহীন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন একজন শিল্পী ও ফটোগ্রাফার এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগঠনের নথিপত্র দেখলেই প্রকৃত বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
এখন ED-র তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হল টাকার লেনদেন। অভিযোগের সঙ্গে কোনও আর্থিক সংগ্রহ, ব্যাঙ্ক লেনদেন, সংস্থার হিসাব বা অন্য কোনও আর্থিক সুবিধা জড়িত ছিল কি না, থাকলে সেই অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় গিয়েছে তদন্তকারীরা সেই সূত্রই খুঁজছেন। ২৯ সেপ্টেম্বরের তল্লাশি সেই তদন্তকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল।
তবে তল্লাশি বা FIR হওয়া কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এমন অর্থ বহন করে না। ED-র তল্লাশির পর উদ্ধার হওয়া নথি, ডিজিটাল তথ্য ও আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড বিশ্লেষণের পরই তদন্তের পরবর্তী দিক স্পষ্ট হবে। এখন নজর থাকবে, এই অভিযানে ED কী কী নথি বা তথ্য সংগ্রহ করে এবং তদন্তে আর কারও ভূমিকা সামনে আসে কি না।
