রাত গভীর। চারদিক নিস্তব্ধ। জঙ্গল ছেড়ে ধীরে ধীরে গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে একদল বুনো হাতি। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে বিপদ টের পেতে পেতে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। কিন্তু এবার তার আগেই সক্রিয় হয়ে উঠল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বনদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকক্ষে পৌঁছে গেল সতর্কবার্তা। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে হাতির পালকে নিরাপদে জঙ্গলের দিকে ফিরিয়ে দিল বনকর্মীরা। ফলে রক্ষা পেল গ্রাম, একই সঙ্গে অযথা আতঙ্ক বা সংঘাতের মুখেও পড়তে হল না হাতিদের।
এই ঘটনাই এখন নেটদুনিয়ায় চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। ভারতীয় বন দপ্তর (IFS) আধিকারিক পারভিন কাসওয়ান সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে দেখিয়েছেন, কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তি আজ বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ এবং মানুষের নিরাপত্তা— দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, রাত ১২টা ৩২ মিনিট নাগাদ একটি হাতির পাল বনাঞ্চল ছেড়ে জনবসতির দিকে এগোতে শুরু করে। এলাকাজুড়ে বসানো এআই-সমৃদ্ধ স্মার্ট ক্যামেরা সেই গতিবিধি সঙ্গে সঙ্গেই শনাক্ত করে। কোনও মানুষের নজরের অপেক্ষা না করেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বনদপ্তরের কন্ট্রোল রুমে সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় র্যাপিড রেসপন্স টিম। পরিকল্পিতভাবে হাতির চলার পথ ঘুরিয়ে দিয়ে তাদের আবার নিরাপদে জঙ্গলের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কোনও ক্ষয়ক্ষতি বা সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি।
ভিডিওটি শেয়ার করে পারভিন কাসওয়ান লিখেছেন, এটি কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিনই এআই-নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা থেকে একাধিক সতর্কবার্তা আসে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই বনকর্মীরা দ্রুত পদক্ষেপ করেন। তাঁর কথায়, প্রযুক্তি শুধু তথ্য সংগ্রহের কাজই করছে না, অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য দুর্ঘটনা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করতেও সাহায্য করছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মানুষ-হাতি সংঘাত এখন ক্রমশ বড় উদ্বেগের বিষয়। বনাঞ্চল সঙ্কুচিত হওয়া, হাতিদের প্রাচীন চলাচলের পথ দখল হয়ে যাওয়া এবং খাদ্যের সন্ধানে জনবসতির দিকে চলে আসার প্রবণতা— এই সব কারণেই প্রতি বছর বহু মানুষের মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, ট্রেনের ধাক্কা বা জনরোষের বলিও হয় বহু হাতি। পরিবেশবিদদের মতে, সংঘাতের পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আগে থেকেই সতর্ক হওয়াই একমাত্র কার্যকর উপায়। সেই জায়গাতেই এআই-ভিত্তিক নজরদারি নতুন দিশা দেখাচ্ছে।
বর্তমানে দেশের একাধিক বনাঞ্চলে নাইট ভিশন ক্যামেরা, থার্মাল সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ইমেজ অ্যানালিসিস এবং রিয়েল-টাইম অ্যালার্ট সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই— হাতির অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করা, বনকর্মীদের সতর্ক করা এবং প্রয়োজনে গ্রামবাসীদের আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।
পারভিন কাসওয়ানের পোস্ট প্রকাশ্যে আসতেই নেটমাধ্যমে প্রশংসার ঝড় উঠেছে। অনেকেই লিখেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন ব্যবহারই ভবিষ্যতের পথ দেখায়। কারণ, এই প্রযুক্তি শুধু মানুষের জীবনই রক্ষা করছে না, বন্যপ্রাণীকেও অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। বন সংরক্ষণে প্রযুক্তি যে কতটা কার্যকর হতে পারে, সেই বার্তাই যেন আরও একবার স্পষ্ট করে দিল এই ঘটনা।