নিউজ ডেস্ক: পরিচালনা ও প্রযোজনা ছাড়াও প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেনের অনুপ্রাণিত চরিত্র কুণাল সেনের ভূমিকায় নিজেই অভিনয় করেছেন অঞ্জন দত্ত। দীর্ঘ ১৪ বছরের বিরতির পর আবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন সংগীতশিল্পী-অভিনেতা-পরিচালক অঞ্জন দত্ত। ২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং প্রখ্যাত পরিচালক মৃণাল সেনের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্য স্বরূপ নির্মিত ‘চালচিত্র এখন’ ছবির জন্য সেরা বাংলা ছবির পুরস্কার জিতেছেন তিনি। এর আগে ২০১২ সালে ৫৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাঁর ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’ ছবির জন্য অঞ্জন জোড়া পুরস্কার (বিশেষ জুরি পুরস্কার এবং সেরা বাংলা ছায়াছবি) জিতেছিলেন।
‘চালচিত্র এখন’ পেল জাতীয় পুরস্কার: অভিনেতা হিসেবে নিজের প্রথম ছবি ‘চালচিত্র’ তৈরির দিনগুলিতে ফিরে দেখা এই ছবির মাধ্যমে বিপ্লবী চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেনের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করেছেন অঞ্জন। ছেলে নীল দত্তের সঙ্গে ছবিটি পরিচালনা ও প্রযোজনার পাশাপাশি মৃণাল সেন অনুপ্রাণিত একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন তিনি। মৃণাল সেনের আইকনিক ছবি ‘চালচিত্র’ নির্মাণ এবং বিনোদন জগতে অঞ্জনের নিজের পদার্পণকে ভিত্তি করে তৈরি এই ছবিতে আবারও পর্দায় দেখা গেছে একজন প্রবীণ মৃণাল এবং তরুণ অঞ্জন দত্তকে (যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাওন চক্রবর্তী)। আশির দশকের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই ছবি পরিচালকের জীবনের সেই সময়কাল, বিশেষ করে ‘চালচিত্র’ ছবির জন্মলগ্নের গল্পকে তুলে ধরে।
ছবিটি মুক্তির আগে এক সাক্ষাৎকারে অঞ্জন বলেছিলেন যে, মৃণাল সেনকে এভাবে শ্রদ্ধা জানানো বহু দিন ধরেই বকেয়া ছিল। “আমাদের সম্পর্ক ছিল প্রায় চার দশকের। তাঁর ছবিতে অভিনয় করা ছাড়াও আমি তাঁর সহকারী, লেখক, লাইন প্রডিউসার—বলতে গেলে প্রায় পরিবারের সদস্যই ছিলাম। এই দিকটি আমার কাজের মধ্যে কখনো প্রতিফলিত হয়নি, কারণ এটি খুব ব্যক্তিগত ছিল। তবে আমার অধিকাংশ কাজই আমার ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি হওয়া সত্ত্বেও, এই অংশটি কখনো শেয়ার করা হয়নি। অনেক দিন আগে আমি তাঁর ওপর একটি তথ্যচিত্র বানাতে চেয়েছিলাম, তখন তিনি আমাকে ব্যক্তিগত কিছু তৈরি করতে বলেন। সে সময় কোনো গল্প খুঁজে পাইনি। পরবর্তীকালে অসুস্থ একজন মানুষকে শুট করতে চাইনি। কিন্তু সম্ভবত শতবার্ষিকী ঘনিয়ে আসছিল, আর আমার মনে হলো ঋণ মেটানো এবং নিজের গল্পটা খুঁজে পাওয়া দরকার। একটি ব্যক্তিগত কাজ তৈরি করতে আমাদের সম্পর্ককে বস্তুনিষ্ঠ ও সততার সঙ্গে দেখতে আমার কিছুটা সময় লেগেছিল,” যোগ করেন তিনি।
পুরস্কার প্রাপ্তিতে সুরকার ও প্রযোজক নীল দত্তের প্রতিক্রিয়া
অঞ্জন-পুত্র তথা সুরকার নীল দত্ত, যিনি ‘চালচিত্র এখন’-এর অন্যতম প্রযোজক, ‘ইনডালজ’-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন: “প্রযোজক হিসেবে ‘চালচিত্র এখন’ আমার প্রথম ছবি, তাই স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের গর্ব ও স্বীকৃতি বোধ কাজ করছে। তবে যেটা এটাকে আরও বিশেষ করে তোলে তা হলো, এটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নির্মিত (Independent production) একটি ছবি। সাধারণত সীমিত সংস্থান, বড় স্টুডিওর ব্যাকআপ বা জাঁকজমকপূর্ণ প্রচার ছাড়াই স্বাধীন চলচ্চিত্রগুলো তৈরি হয়। গল্পের ওপর বিশ্বাস এবং যৌথ প্রচেষ্টার জোরই এদের ভিত্তি। এ ধরনের একটি ছবি জাতীয় পুরস্কার পাওয়া প্রমাণ করে যে সততা ও শৈল্পিক নিষ্ঠার মূল্য এখনো আছে, আর বাণিজ্যিক ধারার সহায়তা ছাড়াও অর্থবহ সিনেমা স্বীকৃতি পেতে পারে।”
‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’ ছিল নীলের প্রথম জাতীয় পুরস্কার জয়। সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন: “‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’-র জয়ের সাথে এই জয়ের ফারাক বেশ গভীর। ‘রঞ্জনা’য় আমি ছিলাম সংগীত পরিচালক, আর সেরা সংগীত পরিচালনার জাতীয় পুরস্কার পাওয়াটা ছিল শিল্পী হিসেবে দারুণ এক প্রাপ্তি। সেটা ছিল সিনেমার একটি নির্দিষ্ট বিভাগের স্বীকৃতি—যেখানে সুরকার হিসেবে আমি আমার সমস্ত হৃদয় ঢেলে দিয়েছিলাম।
কিন্তু ‘চালচিত্র এখন’-এর অনুভূতি আলাদা, কারণ সহ-প্রযোজক হিসেবে পুরো ছবিটিকে বাস্তবে রূপ দিতে আমি যুক্ত ছিলাম। এখানে শুধু সৃজনশীল কাজ নয়, বরং অগুণতি ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত, ঝুঁকি, দায়িত্ব এবং পুরো টিমের যৌথ যাত্রার সাথে জড়িয়ে থাকতে হয়। এই পুরস্কার শুধু একটি বিভাগের জন্য নয়; এটি পুরো সিনেমাটিকে সম্মান জানায়। তাই এই তৃপ্তি একেবারেই অন্যরকম—যা শুরু থেকেই এই প্রজেক্টে বিশ্বাস রাখা প্রত্যেকের সাথে ভাগ করে নেওয়ার মতো।”
যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ‘চালচিত্র এখন’ এমন একটি বিরল ছবি যা একই সাথে প্রেক্ষাগৃহে এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘হৈচৈ’ (hoichoi)-এ মুক্তি পেয়েছিল।
তবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারই এই ছবির প্রথম স্বীকৃতি নয়। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগেই চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা কুড়িয়েছে ছবিটি। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ইনোভেশন ইন মুভিং ইমেজেস’-এর জন্য বিশেষ জুরি পুরস্কার এবং ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অঞ্জন দত্ত সেরা অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।




