বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অপেক্ষা করছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড। তাই এটি শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, এ এক ইতিহাস, আবেগ আর পুরানো বৈরিতার এক নতুন অধ্যায়। তবে সেমিফাইনালের আগে কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগই বাড়িয়েছে বেশি। ৩-১ ব্যবধানে জয় এলেও লিওনেল মেসিদের খেলায় একাধিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড মানেই অনেকের মনে প্রথমে ভেসে ওঠে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি। কিন্তু দুই দেশের ফুটবল বৈরিতার সূচনা তারও আগে, ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে লাল কার্ড দেখানোর ঘটনায় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। মাঠ ছাড়তে অস্বীকার করায় তাঁকে শেষ পর্যন্ত পুলিশি সহায়তায় মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ র্যামসে তাঁকে ‘পশু’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন, যা আজও আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে অপমানের প্রতীক হয়ে রয়েছে।
তারপর আসে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ। ব্রিটেনের কাছে পরাজয় এবং শত শত আর্জেন্টিনার প্রাণহানির ক্ষত এখনও দেশটির মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। সেই আবেগই যেন চার বছর পরে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে মাঠে নামিয়ে আনেন দিয়েগো মারাদোনা। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং ছয়জনকে কাটিয়ে করা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
এবার সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লেখার সুযোগ লিওনেল মেসির সামনে। তবে সেমিফাইনালের আগে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। কেপ ভার্দে, মিশর এবং তারপর সুইজারল্যান্ড— প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই শুরুতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। দলের এই ওঠানামা নিয়ে অবশ্য উদ্বিগ্ন নন কোচ লিওনেল স্কালোনি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, “আমাদের দল এমনই। চাপ না এলে সেরা ফুটবল বেরিয়ে আসে না।”
কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যাচের ৭২ মিনিটে সুইজারল্যান্ডের এমবোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। প্রথমে পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখানো হলেও পরে ভিএআরের সাহায্যে সিদ্ধান্ত বদলে এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ এবং লাল কার্ড দেখান পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনহেইরো। এই সিদ্ধান্ত নিয়েই বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
ম্যাচ চলাকালীন এক পর্যায়ে মেসিকে রেফারিকে বলতে শোনা যায়, “আমাকে সম্মান দিয়ে কথা বলুন। আমি আপনাকে অসম্মান করিনি।” যদিও পরে দু'জনের মধ্যে কোনও বড় বিতর্কের ঘটনা ঘটেনি। তবে ম্যাচ শেষে সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন রেফারির সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এমবোলোর লাল কার্ড ফুটবলের স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
ম্যাচের শুরুতে মেসির কর্নার থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেডে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে সুইজারল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধে এনদোয়ের দুর্দান্ত গোলে সমতা ফেরে। এমনকি এমিলিয়ানো মার্টিনেজের সামনে আরও একটি সহজ সুযোগও নষ্ট করে সুইসরা। এমবোলোর লাল কার্ডের পর সংখ্যাগত সুবিধা পেলেও আর্জেন্টিনা খুব সহজে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।
তবে শেষ পর্যন্ত বদলি নেমে জুলিয়ান আলভারেজের অসাধারণ গোল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অনেকের মতে, এই গোলটি ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে। এরপর লাউতারো মার্টিনেজও গোল করে ব্যবধান বাড়ান, যা সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টিনা শিবিরের জন্য বড় স্বস্তির খবর।
তবুও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে একই রকম ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে কি মেসিদের রক্ষা করা সম্ভব হবে? হ্যারি কেনদের বিপক্ষে আরও নিখুঁত, আরও ধারালো এবং আরও সংগঠিত ফুটবল খেলতে হবে আর্জেন্টিনাকে। কারণ ইতিহাসের আবেগ যতই প্রবল হোক, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয় মাঠের পারফরম্যান্সই।




