স্পোর্টস ডেস্ক: বিশ্ব কুস্তির মঞ্চে নতুন ইতিহাস গড়ল ভারত। একই দিনে সিনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠে রুপো জিতলেন ভারতের দুই মহিলা কুস্তিগির নীলম সিরোহি এবং কাজল ধোচক। কাজল ও নীলমের হাত ধরে প্রথম বার সিনিয়র বিশ্ব কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপের একই সংস্করণে মহিলাদের বিভাগে সোনার পদকের জন্য লড়াই করল ভারত। শেষ পর্যন্ত দু’জনেই ফাইনালে হেরে গেলেও তাঁদের এই সাফল্য ভারতীয় মহিলা কুস্তির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখে দিল।
মহিলাদের ৭৬ কেজি বিভাগের ফাইনালে ইউক্রেনের আনাস্তাসিয়া আলপিয়েভার কাছে ৬-৮ ব্যবধানে হারেন ১৮ বছরের কাজল। অন্য দিকে, ৫০ কেজি বিভাগের ফাইনালে জাপানের কিংবদন্তি কুস্তিগির ইউই সুসাকির কাছে হারতে হয় ২৬ বছরের নীলমকে। তবে দু’জনের রুপোর পদক জয়ের গুরুত্ব আলাদা। সিনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে এর আগে ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে একমাত্র অংশু মালিকই রুপো জিতেছিলেন। ২০২১ সালে অসলোয় ৫৭ কেজি বিভাগে সেই নজির গড়েছিলেন তিনি। এ বার নীলম ও কাজল একসঙ্গে ফাইনালে উঠে সেই তালিকায় নতুন নাম যোগ করলেন।
কাজলের ফাইনাল ছিল রুদ্ধশ্বাস। প্রথম তিন মিনিটের লড়াই শেষে ১-৩ পয়েন্টে পিছিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে দুরন্ত প্রত্যাবর্তন ঘটান এই তরুণী। লড়াইয়ে ফিরে স্কোর ৪-৪ করে ফেলেন। ম্যাচ শেষ হতে তখন বাকি মাত্র ৩০ সেকেন্ড। সেই সময় কাজল সোনার পদকের স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আক্রমণাত্মক কুস্তি দেখিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন ইউক্রেনের প্রতিপক্ষ। পর পর আক্রমণে পয়েন্টের ব্যবধান বাড়িয়ে ৮-৪ করে ফেলেন আলপিয়েভা। শেষ দিকে কাজল আরও দু’পয়েন্ট পেলেও ততক্ষণে ম্যাচ হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ৬-৮ ব্যবধানে হেরে রুপো নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাঁকে।
সিনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে এটাই ছিল কাজলের প্রথম অংশগ্রহণ। তবে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে দু’বার সোনা জিতেছেন তিনি। সিনিয়র পর্যায়েও যে তিনি বড় মঞ্চে লড়াই করতে প্রস্তুত, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন কাজল। সেমিফাইনালে কিরঘিজস্তানের আইপেরি মেদেত কিজির বিরুদ্ধে ১-৭ পয়েন্টে পিছিয়ে পড়েও ১০-৭ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে উঠেছিলেন তিনি। সেই প্রত্যাবর্তনের পর ফাইনালেও কঠিন লড়াই করেন ভারতের এই তরুণী।
অন্য দিকে, নীলমের সামনে ছিলেন চার বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জাপানের ইউই সুসাকি। টোকিয়ো অলিম্পিকে সোনা জিতেছিলেন সুসাকি। বিশ্ব কুস্তির অন্যতম সফল এই প্রতিযোগীর বিরুদ্ধে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যান নীলম। জাপানের কুস্তিগির ৫-০ পয়েন্টে এগিয়ে যাওয়ার পরে প্রথম পর্ব শেষ হওয়ার ঠিক আগে নীলমকে চিত করে দেন। ফলে ফাইনালে আর লড়াই জমাতে পারেননি ভারতীয় কুস্তিগির। সোনা জিতে নিজের বিশ্বসেরার খেতাব আরও এক বার প্রতিষ্ঠা করেন সুসাকি।
ফাইনালে ওঠার আগে অবশ্য দুর্দান্ত কুস্তি দেখিয়েছিলেন নীলম। সেমিফাইনালে কাজাখস্তানের জেইনেপ বায়ানোভাকে ৭-৩ ব্যবধানে হারিয়ে খেতাবি লড়াইয়ে জায়গা করে নেন তিনি। এর আগে বেলারুশের নাতালিয়া ভারাকিনাকে ৬-০ ব্যবধানে হারিয়েছিলেন নীলম। এশিয়ান গেমসে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ না পাওয়ার হতাশা কাটিয়ে বিশ্ব মঞ্চে রুপো জিতে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিলেন ২৬ বছরের এই কুস্তিগির।
দুই ভারতীয়ের এই সাফল্যে মহিলা কুস্তিতে দেশের অগ্রগতির ছবিটা আরও স্পষ্ট হল। বিশেষ করে কাজলের রুপো ভারতীয় মহিলা কুস্তির ভারী ওজনের বিভাগে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিল। এই বিভাগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের পদক এর আগে ভারতের ঝুলিতে আসেনি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে সিনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিতে কাজলও বিশেষ নজির গড়েছেন।
সোনা না পেলেও নীলম ও কাজলের রুপো ভারতীয় কুস্তির কাছে বড় প্রাপ্তি। একই সংস্করণে দুই ভারতীয় মহিলার ফাইনালে ওঠা প্রমাণ করল, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের মহিলা কুস্তিগিরেরা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছেন। এ বার সেই সাফল্যকে সোনার পদকে বদলে দেওয়াই হবে পরবর্তী লক্ষ্য।




