গঙ্গারামপুর, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: গঙ্গারামপুর শহর ছাড়িয়ে উত্তরমুখী রাস্তা। পাশে টাঙন, পুনর্ভবা আর আত্রেয়ী তিন নদীর ভূগোল যেন এই জনপদের ইতিহাসের সঙ্গেও মিশে আছে। শহর থেকে মাত্র দু’কিলোমিটার দূরে রাস্তার ধারে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার নীল সাইনবোর্ড। লেখা ‘বানগড়’। সেখানেই যেন আচমকা বদলে যায় সময়ের হিসাব। আধুনিক রাস্তা থেকে কয়েক পা এগোলেই সামনে পড়ে প্রাচীন জনপদের ধ্বংসাবশেষ। কোথাও মাটির ঢিবি, কোথাও পুরনো ইট-পাথরের চিহ্ন, কোথাও খনন করা অংশ। এক সময় যে জায়গায় জনজীবনের স্পন্দন ছিল, আজ সেখানে নীরবতা। অথচ সেই নীরব মাটিই বহন করছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস।
প্রেম, রাজনীতি আর ‘ঊষাহরণ’-এর গল্প
বানগড়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে কাহিনি উচ্চারিত হয়, তা অনিরুদ্ধ ও ঊষার প্রেমকাহিনি। লোককথা অনুযায়ী, বানরাজ বা বানাসুরের কন্যা ঊষার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের পৌত্র অনিরুদ্ধের। কিন্তু এই সম্পর্ক মেনে নেননি বানরাজ। দুই পক্ষের বিরোধ চরমে ওঠে। স্থানীয় লোকবিশ্বাসে, ঊষাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে পথ দিয়ে, সেই পথই পরে ‘ঊষাহরণ রাস্তা’ নামে পরিচিত হয়। ইতিহাসের সঙ্গে পুরাণের এই মেলবন্ধনই বানগড়কে দিয়েছে আলাদা আকর্ষণ। আজও স্থানীয় মানুষের মুখে ঘোরে ঊষা-অনিরুদ্ধের সেই প্রেমের গল্প। পর্যটকেরাও বানগড়ে এসে প্রথমে খোঁজেন সেই কাহিনির চিহ্ন।
শুধু পুরাণ নয়, মাটির নীচেও মিলেছে ইতিহাস
তবে বানগড়ের গুরুত্ব শুধু লোককথায় নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক খননই এই জায়গার আসল পরিচয় সামনে এনেছে। বিভিন্ন সময়ে খননকার্যে পাওয়া প্রত্নসামগ্রী থেকে গবেষকদের ধারণা, একাধিক যুগে এই এলাকায় জনবসতি ছিল। মৌর্য, শুঙ্গ, গুপ্ত, পাল, সেন এবং পরবর্তী মুসলিম আমলের নানা নিদর্শনের উল্লেখ পাওয়া যায়। মূর্তি, মুদ্রা, স্থাপত্যের অংশ-সহ বিভিন্ন প্রত্নসামগ্রী এই অঞ্চলের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। অর্থাৎ বানগড় কোনও একটি সময়ের স্মৃতিচিহ্ন নয়। বহু যুগের পরিবর্তন, উত্থান-পতন এবং জনজীবনের স্তর যেন একটির উপর আর একটি চাপা পড়ে রয়েছে এই মাটির নীচে।
প্রথম খননেই খুলেছিল ইতিহাসের দরজা
বানগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ইতিহাসও যথেষ্ট পুরনো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কুঞ্জগোবিন্দ গোস্বামীর নেতৃত্বে ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে এখানে প্রথম বড় আকারের খননকার্য শুরু হয়। খননে মাটির নীচে একাধিক বসতি স্তরের সন্ধান পাওয়া যায়। উদ্ধার হয় বিভিন্ন প্রত্নসামগ্রী। সেই সময় থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে, বানগড় একটি সাধারণ প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ নয়। এর নীচে লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের বসতির ইতিহাস। কিন্তু প্রথম দফার কাজের পর দীর্ঘ সময় কার্যত থমকে ছিল বানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান।
২০০৭-০৯-এ ফের খনন, ফের মিলল নিদর্শন
দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৭ সালে ফের বানগড়ে খনন শুরু হয়। পরের দু’বছর, অর্থাৎ ২০০৮ এবং ২০০৯ সালেও কাজ চলে। সেই পর্বেও উদ্ধার হয় মূর্তি, মুদ্রা এবং নানা স্থাপত্যের অংশ। ইতিহাসবিদদের দাবি, এই খনন থেকে বানগড়ের প্রাচীনত্ব এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসে। উদ্ধার হওয়া প্রত্নসামগ্রীর বড় অংশ বর্তমানে বালুরঘাটের বিভিন্ন সংগ্রহশালা ও প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন, যে জায়গার মাটি খুঁড়ে ইতিহাস পাওয়া গেল, সেই বানগড়েই কেন সেই ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শন হবে না?
মিউজিয়াম চাই, বানগড়ের পাশেই
পর্যটক এবং ইতিহাসপ্রেমীদের দাবি, বানগড়ের কাছেই একটি প্রত্নসংগ্রহশালা তৈরি করা হোক। খনন করে উদ্ধার হওয়া মূর্তি, মুদ্রা, মৃৎপাত্র এবং স্থাপত্যের অংশ যদি বানগড়ের পাশেই রাখা যায়, তা হলে পর্যটকের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বদলে যাবে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ শুধু ভগ্নাবশেষ দেখতে আসবেন না, তাঁরা জানতে পারবেন এই মাটির নীচে কোন সভ্যতা ছিল, কী ভাবে সেই জনপদ গড়ে উঠেছিল এবং কোন কোন যুগ পেরিয়ে বানগড় আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে। পর্যটক কৌশিক শীলের কথায়, প্রথম বার বানগড়ে এসে তাঁর ভাল লেগেছে। তাঁর মতে, পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র তৈরি হলে আরও বেশি মানুষ এই জায়গায় আসবেন এবং বানগড়ের পরিচিতি রাজ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে।
অযত্নে প্রত্নস্থল, জমি নিয়ে প্রশ্ন
বানগড়ের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলির একটি জমি সংরক্ষণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্নস্থলের বিস্তীর্ণ অংশের চারপাশে দীর্ঘদিন যথাযথ নিরাপত্তা ছিল না। ফলে কোথাও কোথাও জমি দখল করে চাষবাস শুরু হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রাণগোপাল সাহার দাবি, বর্তমানে বানগড়ের চারপাশে প্রাচীর দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। দখল হয়ে যাওয়া জমি চিহ্নিত করে তা সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে নতুন করে খনন বা গবেষণার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। কারণ এখনও কতটা ইতিহাস মাটির নীচে চাপা রয়েছে, তার সম্পূর্ণ হিসাবই নেই।
ইতিহাসবিদের চোখে ‘প্রত্নতত্ত্বের আঁতুড়ঘর’
দক্ষিণ দিনাজপুর হেরিটেজ সোসাইটির সভাপতি তুহিনশুভ্র মণ্ডলের মতে, জেলার ইতিহাসে বানগড় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খননের মাধ্যমে যে তথ্য উঠে এসেছে, তার যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা এখনও তৈরি হয়নি। ইতিহাসবিদ সমিত ঘোষের বক্তব্য, দক্ষিণ দিনাজপুরের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের অন্যতম কেন্দ্র বানগড়। বিভিন্ন সময়ের খননে একাধিক যুগের স্থাপত্য ও প্রত্নসামগ্রী পাওয়া গিয়েছে। তাঁর মতে, নতুন করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খনন শুরু হলে আরও বহু অজানা তথ্য সামনে আসতে পারে।
১২৫০ একর জমি ঘিরে বড় পরিকল্পনা
গঙ্গারামপুরের বিধায়ক সত্যেন্দ্রনাথ রায়ের দাবি, বানগড়কে প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে রাজ্য সরকারের তরফে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বানগড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও প্রায় ১২৫০ একর জমি রয়েছে। সেই জমিকে পরিকল্পিত ভাবে ব্যবহার করে পর্যটন পরিকাঠামো তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রকের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। বানগড়ের সঙ্গে ধলদিঘি-সহ আশপাশের ঐতিহাসিক স্থানগুলিকেও পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।
পর্যটন হলে বদলাবে গোটা এলাকার অর্থনীতি?
বানগড়কে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্র তৈরি হলে শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষিত হবে না, বদলাতে পারে গোটা এলাকার অর্থনীতি, এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা। হোটেল, রেস্তরাঁ, পরিবহণ, স্থানীয় হস্তশিল্প, গাইড পরিষেবা পর্যটক বাড়লে তৈরি হতে পারে একাধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ। একই সঙ্গে দক্ষিণ দিনাজপুরের অন্য ঐতিহাসিক স্থানগুলিকেও একটি পর্যটন সার্কিটের মধ্যে আনা সম্ভব। শীতের মরসুমে বানগড়ে পর্যটকের আনাগোনা বাড়ে। পরিকল্পিত পরিকাঠামো তৈরি হলে সারা বছর পর্যটক টানার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মাটির নীচে এখনও কত ইতিহাস?
বানগড়ের সবচেয়ে বড় রহস্য এখানেই। কয়েক দফা খননেই যখন এত প্রত্নসামগ্রী মিলেছে, তখন এখনও যে মাটির নীচে আরও বহু ইতিহাস চাপা থাকতে পারে, তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কোনও ভাঙা ইট, কোনও পাথরের স্তম্ভ কিংবা মাটির নীচে পাওয়া একটি ছোট মুদ্রা প্রত্নতাত্ত্বিকের কাছে এগুলিই হয়ে উঠতে পারে হারিয়ে যাওয়া একটি যুগের সূত্র। তাই বানগড়ে নতুন করে খনন শুরু করার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
ঊষার প্রেমকাহিনি থেকে প্রত্নতত্ত্বের পাঠ
বানগড়ের আকর্ষণ আসলে দু’টি ভুবনের মিলনে। এক দিকে অনিরুদ্ধ-ঊষার প্রেমকাহিনি, বানরাজের কিংবদন্তি, ঊষাহরণের রাস্তা। অন্য দিকে মাটির নীচে পাওয়া বাস্তব প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ। এই দুইয়ের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আজকের বানগড়। রাজপ্রাসাদ নেই। সেই প্রাচীন নগরের কোলাহল নেই। নেই সেই সময়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কোনও প্রত্যক্ষ সাক্ষী। পড়ে রয়েছে শুধু ধ্বংসাবশেষ আর মাটির নীচে চাপা অসংখ্য প্রশ্ন।
তাই এখন প্রয়োজন শুধু পর্যটনের নামে সৌন্দর্যায়ন নয়। প্রথমে ইতিহাসকে বাঁচাতে হবে, তারপর ইতিহাসকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। নতুন করে খনন, প্রত্নস্থলের সুরক্ষা, উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর সংগ্রহশালা এবং পরিকল্পিত পর্যটন পরিকাঠামো এই চারটি কাজ একসঙ্গে এগোলে বানগড় শুধু দক্ষিণ দিনাজপুরের গর্ব থাকবে না। বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্রেও নতুন করে জায়গা করে নিতে পারে এই প্রাচীন জনপদ। ঊষা-অনিরুদ্ধের প্রেমের গল্প এখনও লোকের মুখে। এ বার কি বানগড়ের মাটির নীচে ঘুমিয়ে থাকা ইতিহাসও কথা বলবে? সময়েই মিলবে সদুত্তর ৷