নিউজ ডেস্ক: স্বপ্নাদেশ পেয়ে কলকাতা ছেড়ে বর্ধমানের জঙ্গলমহলে আসা, নবাবের কাছ থেকে জমি কিনে দালান তোলা আর সেই ভিটেতেই টানা ২৬৩ বছর ধরে চলে আসা এক অনন্য শারদোৎসব। শহরের প্রাচীন প্রামাণিক বাড়ির দুর্গাপুজো যেন ইতিহাস, ভক্তি এবং পারিবারিক বিশ্বাসের এক নিবিড় মেলবন্ধন।
পৌরাণিক ইতিহাস অনুযায়ী, আজ যেখানে জনবহুল বেড়মোড় এলাকা, আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে তা ছিল গভীর জঙ্গলে ঢাকা। তৎকালীন কলকাতার প্রতিষ্ঠিত সুরা ব্যবসায়ী বিহারীলাল প্রামাণিক এক রাতে দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে নির্দেশ দেন বর্ধমানের সেই অরণ্যঘেরা প্রান্তরে পৌঁছানোর। স্বপ্নাদেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে বর্ধমানে পৌঁছে বিহারীলাল দেখেন, গহিন জঙ্গলের মাঝে এক বৃদ্ধা একমনে দেবীর আরাধনা করছেন। সেখানে মন্দির প্রতিষ্ঠার সংকল্প করতেই সামনে আসে বড় বাধা জায়গাটি ছিল তৎকালীন নবাবের খাস তালুক। তবে পিছু হটেননি বিহারীলাল। নবাবের দরবারে গিয়ে অকপটে জানান নিজের স্বপ্নাদেশের কথা। ইতিহাস বলে, নবাবও সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে জমিটি বিক্রি করতে সম্মত হন। এরপরেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় গড়ে ওঠে দুর্গাদালান ও প্রামাণিক বাড়ি।
সময়ের নিয়মে জৌলুশ কিছুটা ফিকে হলেও ২৬৩ বছরের সাবেক আচার-অনুষ্ঠানে আজও এতটুকু মরচে পড়েনি। এই বাড়ির পুজো পুরোপুরি বৈষ্ণব মতে পরিচালিত, তাই রক্তক্ষয়ী বলিদানের কোনও স্থান এখানে নেই।
পরিবারের বর্তমান সদস্য চৈত্র প্রামাণিক জানান, বলি না থাকলেও সন্ধিক্ষণের প্রস্তুতি এখানকার প্রধান আকর্ষণ। সন্ধিপুজো শুরুর কিছু আগে গোটা ফল দিয়ে তৈরি এক বিশেষ মালা পরানো হয় প্রতিমাকে। পুজো শেষে সেই ‘প্রসাদী ফল’ পাওয়ার জন্য ভক্তদের কাড়াকাড়ি আজও ঠিক একই রকম রয়েছে। মায়ের চরণে নিবেদিত হয় ১০৮টি পদ্মপাপড়ি ও প্রজ্জ্বলিত ১০৮টি মঙ্গলপ্রদীপ।
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর হলো সন্ধিক্ষণের এক বিশেষ প্রথা। বেদীর সামনে সযত্নে পাতা হয় গদিমোড়া নরম এক সুসজ্জিত বিছানা। পরিবারের অটুট বিশ্বাস, সন্ধিক্ষণের মুহূর্তে স্বয়ং দেবী দুর্গা অলৌকিক পদচিহ্নে সেই বিছানার ওপর দিয়ে হেঁটেই অধিষ্ঠান করেন গর্ভগৃহে।
এই পারিবারিক পুজোর আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিমার চালচিত্র। এখানে সিংহবাহিনী দুর্গার চার ছেলে-মেয়ের পাশাপাশি অবস্থান করেন তাঁর দুই চিরসঙ্গী জয়া ও বিজয়াও। আশ্চর্যের বিষয়, সুদূর অতীতে বিহারীলালের আমলে নিমকাঠ বা শালকাঠে তৈরি যে আদি কাঠামোয় প্রথম প্রতিমা গড়ে উঠেছিল, দীর্ঘ আড়াইশো বছর পেরিয়েও সেই মূল কাঠামোটি অবিকৃত। বিজয়াদশমীতে বিসর্জনের ঠিক পরের দিন সকালেই নদী থেকে তুলে আনা হয় সেই কাঠামো। আবার নতুন আশ্বিনে সেই কাঠেই মাটি লেপে রূপ পান দশভুজা।
