JAZZBAAT 24 BANGLA
১৩ অক্টো ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
Breaking
Suvendu Adhikari: পুজোর উদ্বোধনের ফাঁকে দিল্লি সফরে মুখ্যমন্ত্রী, জল্পনা শুরু রাজনৈতিক মহল... Anaya Bangar: নেটে ব্যাট হাতে ঝড় অনয়ার, পুরুষ বোলারদের বিরুদ্ধে হাঁকালেন একের পর এক ছক্কা Makhi Janata Party: CJI-এর মন্তব্য ঘিরে ৭২ ঘণ্টায় ভাইরাল, CJP-র সঙ্গে হাত মেলানোর উদ্যোগ Abhijit Deepke: দাদুর দুই বিয়ে? সমাজমাধ্যমে প্রশ্নের মুখে CJP প্রধান অভিজিৎ দীপকে, পাল্টা... Pakistan: লাইনচ্যুত রহমান বাবা এক্সপ্রেস, মৃত ৫, আহত অন্তত ৩০ Soudi Attack: সৌদিতে হুথি-হামলার আতঙ্ক! বাঙ্কারে সরানো হচ্ছে যুবরাজকে, ১৭ Neha Bora: নেহার লাল টি-শার্টে ‘ওয়ান পিস’-এর খুলি! Ladakh: ২৮টি জায়গার নামকরণ ঘিরে নতুন সংঘাত Suvendu Adhikari: পুজোর উদ্বোধনের ফাঁকে দিল্লি সফরে মুখ্যমন্ত্রী, জল্পনা শুরু রাজনৈতিক মহল... Anaya Bangar: নেটে ব্যাট হাতে ঝড় অনয়ার, পুরুষ বোলারদের বিরুদ্ধে হাঁকালেন একের পর এক ছক্কা Makhi Janata Party: CJI-এর মন্তব্য ঘিরে ৭২ ঘণ্টায় ভাইরাল, CJP-র সঙ্গে হাত মেলানোর উদ্যোগ Abhijit Deepke: দাদুর দুই বিয়ে? সমাজমাধ্যমে প্রশ্নের মুখে CJP প্রধান অভিজিৎ দীপকে, পাল্টা... Pakistan: লাইনচ্যুত রহমান বাবা এক্সপ্রেস, মৃত ৫, আহত অন্তত ৩০ Soudi Attack: সৌদিতে হুথি-হামলার আতঙ্ক! বাঙ্কারে সরানো হচ্ছে যুবরাজকে, ১৭ Neha Bora: নেহার লাল টি-শার্টে ‘ওয়ান পিস’-এর খুলি! Ladakh: ২৮টি জায়গার নামকরণ ঘিরে নতুন সংঘাত

Durga Puja: রাজকীয় ঐতিহ্য ও প্রাচীন আচার বেঁচে থাকে একই ভাবে আজও মল্ল রাজাদের দুর্গা পুজোয়

Durga Puja: রাজকীয় ঐতিহ্য ও প্রাচীন আচার বেঁচে থাকে একই ভাবে আজও মল্ল রাজাদের দুর্গা পুজোয়
ছবি: গ্রাফিক্স ও এআই দ্বারা নির্মিত

নিউজ ডেস্ক: ‘দেশাচার ও কুলাচার’-ভেদে বঙ্গদেশের দুর্গোৎসবের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। প্রসিদ্ধ পুরোহিতবংশের এক-এক ধরণের দুর্গাপূজা পদ্ধতির পুঁথি আছে। সেই পদ্ধতিতে পুরোহিত যজমানেরা পূজা করে থাকেন। বিভিন্ন রাজবংশেরও ভিন্ন ভিন্ন পূজাপদ্ধতি ও উৎসব-বৈচিত্র্য আছে। এই প্রবন্ধ বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের দুর্গোৎসবের বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্যের বিষয়ে। বঙ্গদেশের বনেদী রাজবংশের প্রধান বিষ্ণুপুরের মল্লরাজবংশের দুর্গোৎসবের বিশেষত্বের মধ্যে চিন্তার খোরাক যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায়। 

মহাভারতের ‘ভীষ্মপর্বে’ (২৩তম অধ্যায়ে) ‘অর্জুন’ ‘বাসুদেবের’ বাক্যানুসারে দুর্গার স্তব করেছিলেন এই বলে - “হে গোপেন্দ্রাজে নন্দগোপকুলসত্তবে কোকমুখে! তুমি জম্বু, কতক ও চৈত্য-বৃক্ষের কাছে নিরন্তর বিরাজ কর। হে কান্তারবাসিনী, তোমার প্রসাদে রণক্ষেত্রে আমরা যেন জয়লাভ করতে পারি।” দুৰ্গা ‘কোক-মুখা’৷ ‘কোক’ অর্থে ‘বন্যকুক্কুর’ বা ‘বন্য-কুকুর’ বোঝায়। দুর্গার নাম ‘শিবা’, শিবা শব্দের অর্থ ‘শৃগালী’। দুর্গা থাকেন কোথায়? দুর্গার এক নাম ‘বিন্ধ্য বাসিনী’। দুর্গা ‘কান্তারবাসিনী’। কান্তারে ‘জম্বু’, ‘কতক’ ও ‘চৈত্য-বৃক্ষের’ সন্নিধানে দুর্গা বিরাজ করেন। ‘জম্বু’ গাছ হল ‘জামগাছ’, ‘কতক’ হল ‘অরিষ্ট’ - একরকম ফলের গাছ। ‘চৈত্যবৃক্ষ’ও গাছ, হয়ত ‘অশ্বত্থ গাছ’। ‘বিন্ধ্যবাসিনী’, ‘কান্তারবাসিনী’ দুর্গা পার্বত্য অঞ্চলে অরণ্যে বাস করেন এবং গাছে গাছে বিরাজ করেন। দুর্গা ‘কোকমুখা’ ও ‘শিবা’। বৃক্ষ ও বন্যজ, পর্বত ও অরণ্য - দুর্গার ধ্যান-ধারণার সঙ্গে জড়িত। কেন জড়িত? দুর্গার উৎপত্তি সেখান থেকে।

আদিম অরণ্যবাসী ও পর্বতবাসীর ধ্যানের দেবতা হলেন দুর্গা। তাই তিনি বৃক্ষে বৃক্ষে বিরাজ করেন। তাই তিনি ‘কোকমুখা’ ও ‘শিবা’। তাই তিনি ‘বিন্ধ্যবাসিনী’ ও ‘কান্তারবাসিনী’। পরে, অনেক পরে, দুর্গা সমগ্র বাঙালি জাতির উপাস্য দেবী হয়েছিলেন। ‘কান্তারবাসিনী’র কথায় ‘বনদুর্গা’র কথা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। ‘বনদুর্গা’ বাঙ্গালীর গৃহদুর্গায় পরিণত হয়েছেন। ‘বনদুর্গা’ ও ‘চণ্ডী’ হয়েছেন ‘শিবের ঘরণী’। গৃহী ও গৃহিণীরা মনে করেন, ‘পার্বতী উমা’ তিনদিনের জন্য পিতৃগৃহে এসেছেন। তিনদিন পরে আবার তিনি শ্বশুরালয়ে ফিরে যাবেন। গৃহিণী কন্যাকে ‘নিৰ্মঞ্চন’ করেন, যেটাকে বলা হয় ‘বরণ’। অশ্রু ছল ছল চোখে, রুদ্ধকণ্ঠে বলেন, “আসছে বছর আবার এসো মা!” যিনি ‘চণ্ডী’, যিনি ‘বনদুর্গা’, তাঁকে বাঙালিরা শুধু ঘরের দেবতা নয়, একেবারে ‘ঘরের মেয়েতে’ রূপান্তরিত করেছেন। এই পরমাত্মীয়করণই বাঙালির প্রধান মানসিক বৈশিষ্ট্য। দুর্গা কিন্তু আসলে ‘কান্তারবাসিনী’, ‘বিন্ধ্যবাসিনী’, ‘বনদুর্গা’, ‘চণ্ডী’, ‘কোকমুখা’, ‘শিবা’। ‘বাঁকুড়া’র ‘রাইপুরে’ দুর্গার ‘কোকমুখা পাষাণমূর্তি’ আজও পূজিত হয়, আগে সেটা গাছতলায় হত, এখন মন্দিরে হয়। ‘বাঁকুড়া-মানভূম’ অঞ্চলে একাধিক ‘কোকমুখা দুর্গা’র পূজার খবর পাওয়া যায়।

মূর্তিপূজার বদলে ‘ঘটপূজা’ ও ‘পট পূজা’র প্রথা আজও ‘বাঁকুড়া’ ও ‘বীরভূম’ অঞ্চলে প্রচলিত আছে। ‘বাঁকুড়া’র ‘বিষ্ণুপুরের’ পূজায় ‘নবপত্রিকা’র পূজার বিশেষ গুরুত্ব আছে, এখনও সেখানে দেখা যে বস্ত্রাচ্ছাদিত ‘নবপত্রিকা’র উপরে একটি ‘মাটির নারীমুণ্ড’ স্থাপিত হয় এবং ‘নবপত্রিকা’ দুর্গারূপে পূজিত হয়। ‘বিষ্ণুপুরের ভট্টাচার্যবাড়ি’তে ধাতুনির্মিত দশভুজা প্রতিমার উপরে একটি ‘মাটির নারীমুণ্ড’ স্থাপিত হয়, প্রতিমা ঢাকা থাকে৷ সেটাকে ‘মুণ্ডপূজা’ বলা হয়৷ জনশ্রুতি আছে, বিষ্ণুপুরের ‘মৃন্ময়ী দেবী’র সামনে মল্লরাজারা এককালে ‘নরবলি’ দিতেন। সেই জনশ্রুতি গবেষকদের মূল্যহীন বলে মনে হয় না। কারণ মল্লরাজাদের পোষ্য ডাকাতের দল যে ‘বীর হাম্বীরের’ সময় পর্যন্ত ছিল তাতে কারো সন্দেহ নেই। ডাকাতি ও শক্তিপূজার অঙ্গ হিসাবে ‘নরবলি’ একশতাব্দী আগেও আমাদের দেশে হত। লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, যেখানে ‘নরবলি’ পর্যন্ত হত, সেই বিষ্ণুপুরে বর্তমানে দুর্গোৎসবে পশুবলি একেবারে নিষিদ্ধ। এই বিস্ময়কর পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ‘বৈষ্ণবধর্মের’ প্রভাবে। ‘বৈষ্ণবধর্ম’ সেখানে ‘রাজধর্ম’ ছিল বলে বাঙালীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘শক্তি-মহোৎসব’ বর্তমানে সময়ে বিষ্ণুপুরে ‘বৈষ্ণব-মহোৎসবে’ পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিষ্ণুপুরের রাজার দুর্গোৎসবের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে কোন বিশেষ ‘সম্প্রদায়ের’ তেমন প্রভাব নেই। ইতিহাসের প্রত্যেক স্তরের ধর্মাচরণ তার মধ্যে আজও প্রকট হয়ে ওঠে।
                            
বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের দুর্গোৎসব বঙ্গদেশের অন্যান্য দুর্গোৎসবের অনেক আগে থেকে আরম্ভ হয়। সেখানে ‘জিতাষ্টমী’র পরের নবমীতে প্রথমে আসেন ‘বড়ঠাকরুণ’। রূপোর পাতে মহিষ মর্দিনী মূর্তি, নাম ‘বড়ঠাকরুণ’। তিনি রাজগৃহেই থাকেন এবং নবমীর দিন রাজার ঘর থেকে তাঁকে এনে ‘কৃষ্ণবাঁধে’ স্থান করিয়ে, ‘নবপত্রিকা’সহ পুজো করে ‘দুর্গা মেলায়’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ‘নবপত্রিকা’ হল - ‘ধান্য’, ‘মান’, ‘রম্ভা’, ‘কচু’, ‘হরিদ্রা’, ‘জয়ন্তী’, ‘বিল্ব’, ‘দাড়িম’ ও ‘অশোক’। ‘নবপত্রিকা’ দুর্গার স্বরূপ বা ‘নবদুর্গা’। ‘বড়ঠাকরুণ’কে এনে ‘মৃন্ময়ীতলা’র সামনে ‘শিরীষ গাছের তলায়’ স্থাপন করে ‘পাটে’ পূজা করা হয়। পরে মেলার উপর পূজা হয়। তারপর থেকে প্রতিদিন নিত্যপূজা হতে থাকে ৷ চতুর্থীর দিন আসেন ‘মেজঠাকরুণ’, তিনি একটি ‘ঘট’ মাত্র। ‘গোপালসায়র’ থেকে রাজপুরোহিত ঘটে জল ভরে নিয়ে আসেন। পরে পুজো হয় ‘মেজঠাকরুণের’। ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যার পরে রাজপুরোহিত ‘ক্ষীরকুলতলা’য় যান। ‘ক্ষীরকুল’ হল এক রকমের ফলের গাছ, বিষ্ণুপুরের রাজবাড়ির পিছনেই আছে সেই ‘ক্ষীরকুলতলা’। 

সেই ‘ক্ষীরকুলতলা’য় আগে বিষ্ণুপুরের রাজাদের অভিষেক হত। আজও অভিষেকের স্থানটি বাঁধানো আছে সেই গাছতলায়। সেই ‘ক্ষীরকুলতলা’র দিকে তাকালে বিষ্ণু পুর রাজবংশের অভিষেক-উৎসবের চিত্রটি আজও চোখের সামনে ভেসে উঠতে বাধ্য। ‘সাঁওতাল’, ‘ধীবর’, ‘বাউরী’, ‘হাড়ি’, ‘ডোম’ ও আদিবাসীদের বাদ্যভাণ্ডসহ নৃত্য গীতোৎসবের কথা মনে পড়তে বাধ্য। সেই ‘ক্ষীরকুলতলা’য় রাজপুরোহিত ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যার পরে যান রাজা-রানীকে ‘দুর্গার পট’ দেখাতে। সেটাকে ‘পটদর্শন' বলে। ঘরের ভিতর থেকে খোপের ফাঁক দিয়ে রাজা ও রাণী ‘পটদর্শন’ করেন। তারপর ‘দুর্গাপট’ নিয়ে রাজপুরোহিত বাদ্যভাণ্ডসহ ‘ক্ষীরকুলতলা’ থেকে ‘শ্যামকুণ্ড’ পার হয়ে ‘বিল্ববৃক্ষতলা’য় আসেন। বিল্বতলায় ‘বোধন’ হয়। পরে ‘দুর্গাপট’সহ ‘দুর্গামেলা’য় এসে পট স্থাপন করা হয়। সেই ‘দুর্গাপট’ই হলেন ‘ছোটঠাকরুণ’। এইভাবে ‘বড়ঠাকরুণ’, ‘মেজঠাকরুণ’ ও ‘ছোটঠাকরুণ’ ‘দুর্গামেলা’য় প্রতিষ্ঠিত হন। ‘বড়ঠাকরুণ’ হলেন ‘মহিষমর্দিনী’, ‘মেজঠাকরুণ’ হলেন ‘জলভরা ঘট’ এবং ‘ছোটঠাকরুণ’ হলেন ‘দুর্গাপট’৷ বিষ্ণুপুরের ‘ফৌজদার বংশের’ শিল্পীরা সেই ‘দুর্গাপট’ আঁকেন। সপ্তমীর দিন রাজবাড়ীর অন্দর থেকে দশভুজা মূর্তির ‘স্বর্ণপট’ বাইরে আনা হয়। স্বর্ণপটের সেই দশভুজা মূর্তিকে বলা হয় ‘পটেশ্বরী’। ‘নবপত্রিকা’ ও ‘দুর্গাপট’সহ ‘পটেশ্বরী’কে ‘কৃষ্ণবাঁধের ঘাটে’ নিয়ে গিয়ে পূজা করা হয়। 

পরে ‘দুর্গামেলা’য় নিয়ে এসে প্রথম নিচে মাটিতে রেখে ‘পাটে’ পুজো হয়। তারপর উপরে তুলে যথারীতি ‘বড়পূজা’ করা হয়। মহাষ্টমীর দিন সকালে ‘অষ্টাদশভুজা উগ্রচণ্ডী বিশালাক্ষী দেবী’ রাজবাড়ির অন্দর থেকে বেরিয়ে ঘরের মধ্যেই স্নান করেন, বাইরের কোন সায়রে যান না। তারপর তিনি সিংহাসনে উপবেশন করেন। মহা-স্নানের পরে পুজোর আয়োজন করা হয়। পূজোর কিছুক্ষণ আগে রাজপোষাক পরে, তলোয়ার হাতে নিয়ে রাজা আসেন, তিনি এসে ‘মহাপাত্রের’ (পুরোহিত) কাছা ধরে দাঁড়ান। মহাপাত্র পুষ্পাঞ্জলি দেন। ছ’বার পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হলে রাজা ‘তোপধ্বনি’ করার হুকুম দেন৷ বংশানুক্রমে ‘মাদোড়’রা তোপ দাগে এবং তার জন্য তাঁরা ‘রাজবৃত্তি’ পায়। কামানের কাছে তাঁরা তোপ দাগার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে। রাজার আদেশ পেলেই তোপদাগা হয়। সমগ্র মল্লভূমের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত তোপধ্বনির প্রতিধ্বনি শোনা যায় এবং সেই শব্দ শোনা মাত্রই সর্বত্র মহিষমর্দিনীর মহাষ্টমীর পুজো আরম্ভ হয়। বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের দুর্গোৎসবের সেটা ‘বংশানুক্রমিক রীতি’। রাজৈশ্বর্য ও রাজত্ব আজ কিছুই নেই, তবু রীতিটি রয়েছে। সারা মল্লভূমব্যাপী লক্ষ লক্ষ লোক আজও মহাষ্টমীর দিন মল্লরাজাদের সেই তোপধ্বনির সঙ্কেত শোনবার জন্য কান পেতে উৎসুক হয়ে থাকেন। 

তোপধ্বনির পরে মহাষ্টমী পুজো আরম্ভ হয়, শুধু রাজবাড়িতে নয়, সারা মল্লভূমে। পূর্বে ‘তামির’ সঙ্কেতে মহাষ্টমী পুজোর তোপধ্বনি করা হত। বড় একটি জলভরা গামলায় ‘তামার কুঁড়ি’ ভাসিয়ে দেওয়া হত এবং সেই ‘তাম্রকুঁড়ি’টি নাকি আপনা থেকেই ডুবে যেত। সেই জলে ডোবার মুহূর্তে মহাষ্টমীপূজার শুভক্ষণ সুচিত হত এবং তোপধ্বনি করা হত সঙ্গে সঙ্গে। এখন সেটা ঘড়ি দেখে রাজার আদেশে করা হয়। নবমীর দিন এক বিচিত্র পূজানুষ্ঠানের রীতি আছে বিষ্ণুপুরে। সেখানে নিশাভোর (রাত বারোটার পর) এক দেবীর পূজা হয়, সেই দেবীর নাম ‘খচ্চরবাহিনী’ (সিংহবাহিনী নন)। ‘ঘটে’ ও ‘পটে’ ‘খচ্চরবাহিনী’র পূজা হয়, কিন্তু দুর্গার ধ্যানেই সেই পূজা হয়। সেই পূজার পদ্ধতিটি বিচিত্র। ঘটের দিকে পিছন ফিরে বসে পুরোহিত পুজো করেন এবং পুজোর সময় কেবল দু’জন পুরোহিত ছাড়া অন্য কেউ সেখানে থাকেন না। কিংবদন্তী আছে, যিনি পুজো করেন তাঁর বংশে বাতি দেওয়ার জন্য আর কেউ জীবিত থাকেন না। দশমীর দিন সকালে রাজা ‘দুর্গামেলা’য় আসেন, এসে নিজে হাতে ধরে ‘নবপত্রিকা’ বিসর্জন দিয়ে আসেন। 

সন্ধ্যার পরে রাজা রাজপোষাক পরে পাল্কী চড়ে ‘ইঁদতলা’য় যান। ‘ইন্দ্রপুজা’ বা ‘ইঁদপরব’ যেখানে অনুষ্ঠিত হয়, তাকেই ‘ইঁদতলা’ বলে। রাজ্যাভিষেকের সঙ্গে ‘ইঁদপরবের’ খানিকটা সম্পর্ক আছে, সেটাকে ‘অভিষেক-উৎসব’ই বলা চলে। ‘ক্ষীরকুলতলা’য় রাজা ও রানীর ষষ্ঠীর দিন ‘পট দর্শন’ এবং দশমীর দিন রাজার ‘ইঁদতলা’য় অনুষ্ঠান, বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রধানতঃ ‘নবপত্রিকা’ দিয়ে ‘ইঁদতলা’য় একটি তোরণ তৈরি করা হয়, সেটার নাম ‘সরক দরজা’। সেই দরজার কাছে ‘অনন্তদেবের পাষাণমূর্তি’ স্থাপন করা হয়। সেই দরজার একদিকে রাজা দাঁড়ান, অন্যদিকে দাঁড়ান পুরোহিতরা। তারপর রাজা একে একে এইগুলি দরজা পার করিয়ে দেন - ‘এঁড়ে গরু’, ‘উত্থান থালা’, ‘তলোয়ার’, ‘ডোমদের ঢোল’, ‘ঢাল’। এপার থেকে রাজা হাতে ধরে দরজা পার করে দেন, ওপার থেকে পুরোহিতরা টেনে নেন। তারপর পাল্কি চড়ে রাজা বিষ্ণুপুর শহরের মধ্যে ‘শাঁখারিবাজারে’ ‘বুড়া-ধৰ্মতলা’য় যান৷ ‘বুড়াধর্ম’ বা ‘বৃহদ্ধাক্ষ’ বিষ্ণুপুরের প্রাচীন ধর্মরাজ ঠাকুর। বুড়াধর্মের স্থান থেকে ঘুরে রাজার বাড়ি ফিরে যাওয়া অর্থহীন নয়। বাড়ি ফিরে গিয়ে ঢাল-তলোয়ার লাঠি নিয়ে রাজা নিজের ফৌজদার ও সেনাপতিদের সঙ্গে খেলা করেন, নৃত্যবাদ্যোৎসব হয়। অতঃপর রাজা তাঁর চৌকিতে এসে বসেন এবং ব্রাহ্মণরা তাঁকে আশীর্বাদ করেন। রাজবাড়ির বাইরে দশমীর দিন ‘কুম্ভকর্ণ-বধের উৎসব’ হয়। দশমীর পরদিন হয় ‘ইন্দ্রজিৎ-বধের উৎসব’। দ্বাদশীর দিন ‘রাবণ-কাটার উৎসব’। বিসদৃশ ‘বাঁদরের সং’ সেজে ‘বাঁদরনৃত্য’ নেচে দলে-দলে লোকে ভিক্ষা করে বাড়ি বাড়ি।

কত বিচিত্র পূজা-পার্বণের আচার-অনুষ্ঠান যে এই দুর্গোৎসবের মধ্যে মিলিত হয়েছে, তার ঠিক নেই ৷ ‘বড়ঠাকরুণ’, ‘মেজঠাকরুণ’, ‘ছোটঠাকরুণ’, ‘ঘট’, ‘দুর্গাপট’, ‘নবপত্রিকা’, ‘মহিষমর্দিনী’, ‘দশভুজা পটেশ্বরী’, ‘অষ্টাদশভুজা উগ্রচণ্ডী বিশালাক্ষী’, ‘সিংহবাহিনী’, ‘খচ্চরবাহিনী’, ‘অনন্তদেব’, ‘ধর্মঠাকুর’ - সকলে এসে মল্লরাজাদের দুর্গোৎসবে মিলিত হয়েছেন। দুর্গোৎসবে এমন বিচিত্র ‘উৎসব-সমন্বয়’ সচরাচর অন্যত্র দেখা যায় না।

বিজ্ঞাপনAdi Mohini Mohan Kanjilal
49 Views 0 Likes 0 Comments

Related News

Durga Puja: দেবী দুর্গার বাহন সিংহই কেন? পুরাণে রয়েছে কী ব্যাখ্যা?
উমাকথা

Durga Puja: দেবী দুর্গার বাহন সিংহই কেন? পুরাণে রয়েছে কী ব্যাখ্যা?

দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দেবী দুর্গার প্রতিমার দিকে তাকালেই চোখে পড়ে তাঁর দশ হাত, হাতে বিভিন্ন অস্ত্র, অসুরবধের দৃশ্য আর পায়ের কাছে থাকা সিংহ। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, দেবীর বাহন হিসেবে সিংহকেই কেন বেছে নেওয়া হয়েছে? হা...

১৩ অক্টো ২০২৬, ০৬:১২ পিএম · 3 মিনিট
Durga Puja: প্যান্ডেলে দেবীর চোখ আঁকার মুহূর্ত! চক্ষুদানের রহস্য ও তাৎপর্য
উমাকথা

Durga Puja: প্যান্ডেলে দেবীর চোখ আঁকার মুহূর্ত! চক্ষুদানের রহস্য ও তাৎপর্য

দুর্গাপুজোর মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ যখন প্রায় শেষ, তখনও যেন কিছু একটা বাকি থাকে। মাটির কাঠামো, খড়ের বাঁধন, মাটির প্রলেপ, রং, অলংকার সবকিছু প্রস্তুত। অথচ দেবীর মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, সেই চেনা প্রাণময় অভিব্যক্তি এখ...

১৩ অক্টো ২০২৬, ০৬:১১ পিএম · 3 মিনিট
Durga Puja: গ্রাম থেকে শিল্পাঞ্চল, বড়জোড়ার পুজোর স্মৃতিতে নতুন উদ্যোগ! চৌমাথা থেকে শিবতলা,আলপনায় সাজবে প্রিয় জনপদ
উমাকথা

Durga Puja: গ্রাম থেকে শিল্পাঞ্চল, বড়জোড়ার পুজোর স্মৃতিতে নতুন উদ্যোগ! চৌমাথা থে...

বিশেষ প্রতিবেদন: ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা এই বড়জোড়াতেই। বড়জোড়া আমার জন্মভূমি, আমার বাড়ি, আমার শিকড়। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে জীবনের ৩০-৩২টা বছর কেটেছে এই বড়জোড়ার পুজোকে কেন্দ্র করেই। ছোটবেলার রঙিন শৈশব, হাজারো নস্টালজিয...

১৩ অক্টো ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম · 2 মিনিট
Durga Puja: দুর্গাপুজোয় কোন রঙের পোশাকের কী তাৎপর্য? শাস্ত্র বনাম প্রচলিত বিশ্বাস
উমাকথা

Durga Puja: দুর্গাপুজোয় কোন রঙের পোশাকের কী তাৎপর্য? শাস্ত্র বনাম প্রচলিত বিশ্বাস

দুর্গাপুজো মানেই নতুন পোশাক, শাড়ির লাল পাড়, অষ্টমীর অঞ্জলি আর দশমীর সিঁদুরখেলা। পুজোর পাঁচ দিনে বাঙালির সাজপোশাকে রঙের যেন এক নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়। কখনও লাল-সাদার চিরন্তন মেলবন্ধন, কখনও হলুদের উজ্জ্বলতা, আবার কখনও নীল,...

১৩ অক্টো ২০২৬, ০৬:০১ পিএম · 3 মিনিট

Top Comments (0)

No approved comments yet.