নয়াদিল্লি: ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে আয় করে মেটা। পাশাপাশি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সামনে কোন কনটেন্ট পৌঁছবে, সেটিও নির্ধারিত হয়। এই পরিস্থিতিতে মেটা আদৌ তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অধীনে ‘ইন্টারমিডিয়ারি’ বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কেন্দ্রীয় ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক।
বুধবার তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, মেটার মতো প্ল্যাটফর্মকে শুধুমাত্র মধ্যস্থতাকারী হিসেবে না দেখে ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, প্ল্যাটফর্মে নির্দিষ্ট কনটেন্ট প্রদর্শনের বিনিময়ে সংস্থাগুলি অর্থ উপার্জন করছে।
ওই আধিকারিকের বক্তব্য, কোনও প্ল্যাটফর্ম তার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কনটেন্ট দেখানোর জন্য অর্থ নিলে তাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে মেটার ‘ইন্টারমিডিয়ারি’ মর্যাদা এবং আইনি সুরক্ষা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের নয়, আদালতের এ কথাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯ নম্বর ধারায় নির্দিষ্ট শর্ত মেনে চলা মধ্যস্থতাকারীদের প্ল্যাটফর্মে তৃতীয় পক্ষের প্রকাশ করা কনটেন্টের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা দেওয়া হয়। তবে সেই সুরক্ষা পেতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত দায়িত্ব এবং ডিউ-ডিলিজেন্সের নিয়ম মানতে হয়।
কেন্দ্রের প্রশ্নের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট বা CSAM-এর অভিযোগ। সম্প্রতি BBC Eye-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ভারতে ইনস্টাগ্রামে কিছু নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দেখানো হয়েছিল, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের এমন টেলিগ্রাম চ্যানেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল যেখানে বেআইনি ভিডিও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর মেটার কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। এরপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে CSAM সংক্রান্ত তথ্য জানানোর প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের বিষয়েও মেটার অবস্থান সামনে আসে। এর আগে মূলত মার্কিন সংস্থা NCMEC-কে রিপোর্ট করার বিষয়টি গুরুত্ব পেত। এখন ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন Indian Cyber Crime Coordination Centre বা I4C-এর সাইবার ক্রাইম পোর্টালে রিপোর্ট জমা দেওয়ার বিষয়েও মেটা রাজি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এরই মধ্যে বুধবার জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন বা NCPCR-এর সামনে হাজির হন মেটা ইন্ডিয়ার ম্যানেজিং ডিরেক্টর অরুণ শ্রীনিবাস। আগের সমনে হাজির না হওয়ায় তাঁকে ফের ডাকা হয়েছিল। প্রায় ৭০ মিনিট ধরে চলা শুনানিতে I4C এবং MeitY-এর আধিকারিকরাও উপস্থিত ছিলেন।
শুনানিতে মেটার ‘সেফ হারবার’ দাবি, CSAM সংক্রান্ত তথ্য ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর প্রক্রিয়া এবং সংস্থার AI-ভিত্তিক কনটেন্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে মেটাকে তাদের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়ার জন্য দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
CSAM সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতীয় আইনের বাধ্যবাধকতাও আলোচনায় এসেছে। POCSO আইনের ১৯ নম্বর ধারায় শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা বা এমন কোনও অপরাধের আশঙ্কা সম্পর্কে অবগত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট করার দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
ফলে মেটার প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, বিজ্ঞাপন থেকে আয়, ব্যবহারকারীদের কাছে কনটেন্ট পৌঁছে দেওয়ার অ্যালগরিদম এবং আইনি ‘সেফ হারবার’ এই একাধিক বিষয় এখন একইসঙ্গে সরকারি নজরদারি ও আইনি পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। মেটার তরফে এই কেন্দ্রীয় আধিকারিকের মন্তব্য নিয়ে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।