কলকাতা: এক ঘূর্ণিঝড়ের রেশ কাটতে না কাটতেই বঙ্গোপসাগরে ফের নতুন করে নিম্নচাপের ভ্রূকুটি! স্থলভাগে ঢুকে ক্রমশ শক্তি হারাচ্ছে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’। তার মধ্যেই দক্ষিণ আন্দামান সাগরে তৈরি হয়েছে আরও একটি নিম্নচাপ। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সেটি আরও শক্তিশালী হয়ে সুস্পষ্ট নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। তবে নতুন এই নিম্নচাপ শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ের চেহারা নেবে কি না, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু জানানো হয়নি। আপাতত নতুন ব্যবস্থাকে ঘিরে কোনও ঘূর্ণিঝড় সতর্কতাও জারি করা হয়নি।
বৃহস্পতিবার কলকাতার আবহাওয়া দফতরের প্রবীণ বিজ্ঞানী এইচ আর বিশ্বাস জানিয়েছেন, দক্ষিণ আন্দামান সাগরের উপর তৈরি হওয়া ঘূর্ণাবর্তটি বৃহস্পতিবার ভোরে নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে সেটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে আন্দামান সাগর এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ সংলগ্ন এলাকায় আরও শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।
এক দিকে শক্তিক্ষয় অর্ণবের, অন্য দিকে নজর নতুন নিম্নচাপে
স্থলভাগে প্রবেশের পরে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টির অবশিষ্ট অংশ দক্ষিণ ছত্তীসগঢ় এবং সংলগ্ন দক্ষিণ ওড়িশার উপর অবস্থান করছিল। গত ছ’ঘণ্টায় সেটি ঘণ্টায় প্রায় ১৮ কিলোমিটার গতিতে এগিয়েছে।
আবহবিদদের অনুমান, স্থলভাগের উপর দিয়ে আরও উত্তর দিকে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে অর্ণবের শক্তি আরও কমবে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যে সেটি সুস্পষ্ট নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। ফলে ঘূর্ণিঝড়টির প্রত্যক্ষ প্রভাব ধীরে ধীরে কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার জেরে তৈরি হওয়া বৃষ্টির পরিস্থিতি পুরোপুরি কাটতে কত সময় লাগবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির উপর।
এরই মধ্যে দক্ষিণ আন্দামান সাগরে নতুন নিম্নচাপ তৈরি হওয়ায় বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়ার উপর নজর রাখছেন আবহবিদেরা। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে সাধারণত বর্ষা-পরবর্তী ঘূর্ণিঝড় তৈরির অনুকূল পরিস্থিতি দেখা যায়। ফলে নতুন নিম্নচাপটি আগামী কয়েক দিনে কতটা শক্তি সঞ্চয় করে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৭২ ঘণ্টায় শক্তি বাড়তে পারে, তবে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস নেই
নতুন নিম্নচাপটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে প্রাথমিক পূর্বাভাস। তবে নিম্নচাপ তৈরি হওয়া মানেই তা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে, এমন নয়। সমুদ্রের উপর বাতাসের গতি, বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে বাতাসের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে কোনও নিম্নচাপ কতটা শক্তিশালী হবে।
আবহাওয়া দফতরের শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী, নিম্নচাপের শক্তি বাড়তে বাড়তে তা প্রথমে নিম্নচাপ, পরে গভীর নিম্নচাপ এবং অনুকূল পরিস্থিতিতে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি নিম্নচাপই সেই পর্যায়ে পৌঁছয় না। নতুন ব্যবস্থাটির সম্ভাব্য গতিপথ ও সর্বোচ্চ শক্তি সম্পর্কে এখনও চূড়ান্ত পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি।
তাই আপাতত নতুন ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কাকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার কারণ নেই। আবহাওয়া দফতরের পরবর্তী বুলেটিনেই বোঝা যাবে, নিম্নচাপটি কোন দিকে এগোচ্ছে এবং তার শক্তি বৃদ্ধির হার কতটা।
অক্টোবর-নভেম্বরে কেন বাড়ে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা?
ভারতের পূর্ব উপকূলের আবহাওয়ার ক্ষেত্রে অক্টোবর ও নভেম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। বর্ষা বিদায়ের পরেও বঙ্গোপসাগরের উপর জলীয় বাষ্প, অনুকূল সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলের বিশেষ পরিস্থিতির কারণে নিম্নচাপ তৈরি হতে পারে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সেই নিম্নচাপ ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিতে পারে।
তবে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি, শক্তি বৃদ্ধি এবং স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা নির্ভর করে একাধিক আবহাওয়াগত উপাদানের উপর। তাই শুধু নিম্নচাপের অবস্থান দেখে তার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
নতুন নিম্নচাপটি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে এগোবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পশ্চিমবঙ্গ বা ওড়িশার উপকূলে তার কোনও প্রভাব পড়বে কি না, সে বিষয়েও এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা হয়নি।
এখন কীসের দিকে নজর আবহবিদদের?
এই মুহূর্তে আবহবিদদের নজর মূলত তিনটি বিষয়ের উপর—নতুন নিম্নচাপের গতিপথ, আগামী ৭২ ঘণ্টায় তার শক্তি বৃদ্ধির হার এবং সেটি আরও সংগঠিত ঘূর্ণাবর্তে পরিণত হচ্ছে কি না। উপগ্রহচিত্র, ডপলার আবহাওয়া রাডার, সমুদ্রের উপর থাকা পর্যবেক্ষণকেন্দ্র এবং আবহাওয়ার গাণিতিক মডেলের তথ্য বিশ্লেষণ করেই পরবর্তী পূর্বাভাস তৈরি করা হবে।
সব মিলিয়ে, অর্ণব দুর্বল হয়ে পড়লেও বঙ্গোপসাগরের উপর নজরদারি এখনই শেষ হচ্ছে না। দক্ষিণ আন্দামান সাগরের নতুন নিম্নচাপ আগামী কয়েক দিনে কতটা শক্তিশালী হয়, তার উপরই নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি। আপাতত ঘূর্ণিঝড়ের কোনও সতর্কতা জারি না হলেও নতুন ব্যবস্থাটির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে নিয়মিত আবহাওয়ার বুলেটিনে নজর রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন আবহবিদেরা।




