ঢাকা: সংস্কারের পর নতুন করে চালু হতেই বিতর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সংগ্রহশালা। মিউজিয়ামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনও ছবি না রেখে তাঁর জায়গায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ আলি জিন্নার ছবি রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সামনে আসতেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে শুরু হয়েছে বিতর্ক ও প্রতিবাদ।
সম্প্রতি নতুন করে সাজিয়ে সংগ্রহশালাটির উদ্বোধন করা হয়। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা, ডাকসু নির্বাচন, বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক জুলাই অভ্যুত্থানের মতো ঘটনাও জায়গা পেয়েছে। পাশাপাশি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির ছবিও রাখা হয়েছে।
কিন্তু মিউজিয়ামের ছবি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ, সংগ্রহশালায় মুজিবুর রহমানের কোনও আলাদা ছবি নেই। অথচ মহম্মদ আলি জিন্নার তিনটি ছবি রাখা হয়েছে। তার মধ্যে ১৯৪৮ সালের রেসকোর্স ময়দানের একটি ঐতিহাসিক ছবিও রয়েছে। ওই সভাতেই জিন্না পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
মুজিবের ছবি না থাকলেও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ছবি এবং সংবাদপত্রের কাটিং সেখানে রয়েছে। ১৯৭৪ সালে তাঁর দুই ছেলের বিয়ের ছবি রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এছাড়া কয়েকটি সংবাদপত্রের কাটিংয়ে মুজিবের ছবি দেখা যাচ্ছে। তবে আলাদা করে তাঁর কোনও ছবি প্রদর্শিত হয়নি।
এই বিষয়টিই ক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ একই সংগ্রহশালায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার মতো একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের ছবি রাখা হয়েছে। ফলে বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কেন মুজিবের ছবি রাখা হয়নি, সে বিষয়ে সংগ্রহশালা কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, ছবি রাখার বিষয়ে তাঁদের ইচ্ছা হয়নি। এই বক্তব্য ঘিরেও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেই ঘটনাটি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৩ সেপ্টেম্বর সংগ্রহশালার উদ্বোধনের পরের দিন দুপুরে আবু তৈয়ব হাবিলদার নামে এক যুবক সেখানে ঢুকে জিন্নার ছবিগুলি ছিঁড়ে ফেলেন বলে অভিযোগ। তাঁর বক্তব্য, জিন্না বাংলাভাষীদের মাতৃভাষার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন এবং ভাষার দাবিতে আন্দোলন করা পড়ুয়াদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় তাঁর ছবি থাকা উচিত নয় বলেই দাবি করেন ওই যুবক।
অন্যদিকে, জিন্নার ছবি রাখার প্রতিবাদে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিতর্কিত জামাত নেতা গোলাম আজমের একটি ছবি সেখানে টাঙিয়ে দেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে আরও উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের তরফে ওই ছবি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে ফেলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ফলে সংস্কারের পর ডাকসুর এই সংগ্রহশালা চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কের কেন্দ্রে। একদিকে বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে জিন্নার ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ এবং পাল্টা ছবি টাঙানোর অভিযোগ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যথেষ্ট উত্তপ্ত।
এখন প্রশ্ন, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ছবি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কী নীতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং কেন বঙ্গবন্ধুর ছবি রাখা হয়নি এই বিতর্কের স্পষ্ট ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষ কীভাবে দেয়।