মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন পথ নিরাপত্তা নিয়ে বারবার সরব হয়েছিলেন তিনি। রাজ্যজুড়ে চালু করেছিলেন 'সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ' কর্মসূচি। হেলমেট ছাড়া মোটরবাইক বা স্কুটিতে চড়লে কড়া জরিমানার নির্দেশও কার্যকর হয়েছিল তাঁর আমলেই। সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এ বার প্রকাশ্যে হেলমেট ছাড়া স্কুটিতে চড়ে প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেন। আর সেই ঘটনাকে ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। পাশাপাশি উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নও, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যে আইন প্রযোজ্য, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও কি তার ব্যতিক্রম হবে?
শনিবার পদ্মপুকুরে তৃণমূলের কর্মসূচিতে পৌঁছেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কর্মসূচি ঘিরে পুলিশের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডাও হয়। এরপর সরকারি গাড়িতে না উঠে একটি স্কুটির পিছনে বসেই কালীঘাটের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে নিজের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। পদ্মপুকুর থেকে কালীঘাট— প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার পথজুড়ে তাঁর মাথায় ছিল না হেলমেট।
স্কুটিটি চালাচ্ছিলেন তৃণমূলের আইটি সেলের দায়িত্বে থাকা উপাসনা চৌধুরী। দলের তরফে প্রকাশিত ভিডিওয় দেখা যায়, স্কুটি চলার সময় উপাসনা স্লোগান দিচ্ছেন— 'স্টুডেন্টস ওয়ান্ট জাস্টিস'। রাস্তার ধারে থাকা সমর্থকেরাও সেই স্লোগানে গলা মেলাচ্ছেন। কখনও হাত নেড়ে, কখনও হাত তুলে তাঁদের সাড়া দিচ্ছেন মমতাও। তবে গোটা যাত্রাপথেই হেলমেটহীন ছিলেন তিনি।
ঘটনার ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। জানা গিয়েছে, যে স্কুটিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাতায়াত করেছেন, সেটি তিলজলার বাসিন্দা মুশতাক আহমেদের নামে নথিভুক্ত। গাড়ির নম্বর WB 01 BE 4336। পুলিশ সূত্রের দাবি, গাড়িটির বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনও বকেয়া মামলা বা ট্রাফিক সংক্রান্ত অভিযোগ নেই।
তবে মোটরযান আইনের বিধান অনুযায়ী, হেলমেট ছাড়া সহযাত্রীকে স্কুটিতে বহন করলে মোটর ভেহিকলস অ্যাক্টের ১২৮ ধারা অনুযায়ী গাড়ির মালিকের কাছে ১,০০০ টাকা জরিমানার নোটিস পাঠানো যেতে পারে। পাশাপাশি, চালকের বৈধ অনুমোদন বা লাইসেন্স সংক্রান্ত কোনও ত্রুটি থাকলে মোটর ভেহিকলস অ্যাক্টের ১৯৭ ধারা অনুযায়ী ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী অন্য ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আক্রমণ শানিয়েছে বিজেপি। দলের বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারির দাবি, আইনের চোখে সবাই সমান। তাঁর বক্তব্য, “যিনি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন হেলমেট বাধ্যতামূলক করেছিলেন, আজ তিনিই প্রকাশ্যে সেই আইন ভাঙছেন। পুলিশের উচিত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করা। তিনি শুধু প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নন, দীর্ঘদিন পুলিশমন্ত্রীও ছিলেন। তাই তাঁর কাছ থেকে আইন মেনে চলার দৃষ্টান্ত প্রত্যাশিত ছিল।”
বিজেপির এই অভিযোগ অবশ্য খারিজ করে দিয়েছে তৃণমূল। স্কুটি চালানো উপাসনা চৌধুরীর পাল্টা প্রশ্ন, “দিলীপ ঘোষ হেলমেট ছাড়া উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মোটরবাইক চালানোর যে ছবি প্রকাশ্যে এসেছিল, তখন কি পুলিশ একইভাবে সক্রিয় হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে, তা হলে এই প্রশ্নের উত্তর দেব। শুধু একটি ঘটনাকে সামনে এনে রাজনৈতিক প্রচার করা হচ্ছে।”
ঘটনার জেরে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে উঠলেও এখন নজর পুলিশের ভূমিকায়। ভাইরাল হওয়া ভিডিও এবং প্রকাশ্যে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনও ব্যবস্থা নেয় কি না, নাকি বিতর্ক শুধুই রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে— সেটাই এখন দেখার।




