দুর্গাপুজোর মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ যখন প্রায় শেষ, তখনও যেন কিছু একটা বাকি থাকে। মাটির কাঠামো, খড়ের বাঁধন, মাটির প্রলেপ, রং, অলংকার সবকিছু প্রস্তুত। অথচ দেবীর মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, সেই চেনা প্রাণময় অভিব্যক্তি এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তারপর আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত, যখন শিল্পীর তুলি ধীরে ধীরে এঁকে দেয় দেবীর চোখ। আর সেই চোখ আঁকার দৃশ্য ঘিরেই তৈরি হয় এক বিশেষ আবেগ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শিল্পকলার অনন্য মেলবন্ধন। এই আচারই পরিচিত ‘চক্ষুদান’ নামে। কিন্তু দেবীর চোখ আঁকার মধ্যে এত গুরুত্ব কেন? এর পিছনে কী রয়েছে ধর্মীয় তাৎপর্য ও বাঙালির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য?
চক্ষুদান: শুধু ছবি আঁকা নয়, এক পবিত্র আচার
বাংলার প্রতিমাশিল্পে দেবীর চোখ আঁকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, দেবীর চোখের মধ্য দিয়েই প্রতিমার মুখে ফুটে ওঠে তাঁর দৃষ্টির শক্তি, করুণা ও মহিমা। শিল্পীর তুলির সূক্ষ্ম টানে চোখের আকৃতি, ভ্রুর রেখা এবং দৃষ্টির অভিব্যক্তি এমনভাবে তৈরি হয়, যাতে দেবীকে মনে হয় জীবন্ত ও জাগ্রত। এই কাজ নিছক নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বহু শিল্পী ও ভক্তের কাছে এটি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তির মুহূর্ত।
তবে চক্ষুদান এবং প্রাণপ্রতিষ্ঠা এক বিষয় নয়। প্রতিমার চোখ আঁকা শিল্প ও ধর্মীয় পরম্পরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। অন্যদিকে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হল মন্ত্র ও নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতার উপস্থিতি আহ্বানের ধর্মীয় বিধি। পুজোর রীতি অনুযায়ী এই আচারগুলির পদ্ধতি ও সময়ে পার্থক্য থাকতে পারে।
মহালয়ার সঙ্গে চক্ষুদানের সম্পর্ক কতটা?
বাংলায় প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, মহালয়ার দিন দেবীর চোখ আঁকার রীতি বিশেষভাবে পরিচিত। মহালয়া পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার সঙ্গে যুক্ত। এই দিনেই বহু মানুষের মনে দুর্গাপুজোর আগমনী অনুভূতি জেগে ওঠে। রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনী শোনা, ভোরের আলো, শিউলি ফুল আর কাশবনের ছবি সব মিলিয়ে মহালয়া বাঙালির কাছে এক আবেগঘন দিন।
অনেক প্রতিমাশিল্পী মহালয়ার দিন দেবীর চোখ আঁকেন বা সেই দিনটিকে এই কাজের জন্য বিশেষভাবে বেছে নেন। তবে সব পুজোয় বা সব প্রতিমাশিল্পীর ক্ষেত্রে মহালয়াতেই চক্ষুদান হয়, এমন কোনও সর্বজনীন নিয়ম নেই। প্রতিমা তৈরির সময়সূচি, স্থানীয় রীতি এবং পুজো কমিটির পরিকল্পনা অনুসারে এই কাজ অন্য দিনেও হতে পারে।
দেবীর চোখের নেপথ্যে শিল্পীর সাধনা
দুর্গাপ্রতিমার চোখ আঁকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দক্ষতার কাজ। চোখের সামান্য পরিবর্তনেও প্রতিমার মুখের অভিব্যক্তি বদলে যেতে পারে। চোখের আকৃতি, কালো রেখা, মণির অবস্থান এবং দৃষ্টির দিক প্রতিটি বিষয়েই শিল্পীকে সতর্ক থাকতে হয়। দেবীর চোখে কখনও ফুটে ওঠে মমতা, কখনও দৃঢ়তা, আবার কখনও অসুরবিনাশিনী রূপের তেজ।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলার প্রতিমাশিল্পীরা এই দক্ষতা অর্জন করেছেন। অনেক পরিবারে প্রতিমা তৈরির কাজ পারিবারিক পেশা হিসেবে চলে আসছে। তাঁদের কাছে চক্ষুদান শুধু শিল্পের শেষ পর্যায় নয়, বছরের পর বছর ধরে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সাধনারও প্রকাশ। প্রতিটি তুলির টানে থাকে নিখুঁত অনুশীলন, নান্দনিক বোধ এবং দেবীর রূপকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা।
চোখের দৃষ্টিতে কেন খুঁজে পান ভক্তরা দেবীকে?
মানুষের মুখের অভিব্যক্তি বোঝার ক্ষেত্রে চোখের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রতিমার চোখ সম্পূর্ণ হওয়ার পর দেবীর মুখও যেন পূর্ণতা পায়। ভক্তদের কাছে এই মুহূর্তটি দেবীর আগমনের অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে। প্রতিমার দিকে তাকিয়ে তাঁরা খুঁজে পান আশ্রয়, শক্তি, মমতা এবং অশুভের বিরুদ্ধে জয়ের প্রতীক।
এই অনুভূতির ব্যাখ্যা ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। চক্ষুদানের মাধ্যমে দেবী আক্ষরিক অর্থে জীবন্ত হয়ে ওঠেন এটি ভক্তিমূলক উপলব্ধি, বৈজ্ঞানিক দাবি নয়। কিন্তু সেই বিশ্বাসের সাংস্কৃতিক শক্তি অস্বীকার করা যায় না। একটি শিল্পকর্ম কীভাবে মানুষের আবেগ, ধর্মীয় অনুভূতি ও সমষ্টিগত স্মৃতির সঙ্গে মিশে যায়, চক্ষুদান তারই এক অনন্য উদাহরণ।
দুর্গাপুজোয় দেবীর চোখ আঁকার মুহূর্ত তাই শুধু প্রতিমা তৈরির শেষ ধাপ নয়। এটি শিল্পীর দক্ষতা, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং বাঙালির আবেগের মিলনস্থল। মাটির প্রতিমার মুখে যখন ফুটে ওঠে সেই পরিচিত দৃষ্টি, তখনই বহু মানুষের মনে যেন সত্যি সত্যি শুরু হয়ে যায় দুর্গাপুজো।
