নিউজ ডেস্ক: দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির আবেগ, উৎসব, নতুন পোশাক, জমিয়ে খাওয়াদাওয়া আর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু ষষ্ঠী থেকে দশমী এই পাঁচটি দিনের প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানের পিছনে রয়েছে নানা পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কেন হয় দেবীর বোধন? কেন অষ্টমীর অঞ্জলি এত গুরুত্বপূর্ণ? নবমীর হোমের তাৎপর্যই বা কী? আর দশমীতেই কেন দেবীকে বিদায় জানানো হয়? দুর্গাপুজোর পরিচিত আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই পাঁচ দিনের পাঁচটি তাৎপর্য জেনে নেওয়া যাক।
১. ষষ্ঠী: অসময়ে দেবীর বোধন কেন?
দুর্গাপুজোর সূচনা ষষ্ঠীর আবহে হলেও এর প্রস্তুতি শুরু হয় মহালয়া থেকেই। প্রচলিত ধর্মীয় কাহিনি অনুসারে, রামচন্দ্র রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। বসন্তকালের প্রচলিত পূজার সময়ের বাইরে শরৎকালে এই আরাধনাকে বলা হয় ‘অকালবোধন’। অর্থাৎ, অসময়ে দেবীকে জাগিয়ে তোলা।
বাংলার দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানে বোধনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেলগাছের কাছে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মতো আচার পালিত হয়। এর মধ্য দিয়েই দেবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুজোর মণ্ডপে আহ্বান জানানোর রীতি সম্পন্ন হয়। তবে মনে রাখা দরকার, রামচন্দ্রের অকালবোধনের কাহিনি মূলত প্রচলিত রামায়ণ-পরম্পরা ও পরবর্তী ধর্মীয় আখ্যানের অংশ; সব প্রাচীন শাস্ত্রে এর বিবরণ একরকম নয়।
২. সপ্তমী: নবপত্রিকায় কেন বাঁধা হয় নয়টি উদ্ভিদ?
সপ্তমীর অন্যতম আকর্ষণ নবপত্রিকা স্নান। বাংলায় অনেকেই একে ‘কলাবউ স্নান’ বলে চেনেন। একটি কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মান ও ধানের মতো উদ্ভিদ একত্র করে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়। আঞ্চলিক রীতি ও পঞ্জিকা অনুসারে উদ্ভিদের পরিচয় বা আচার পালনের ধরনে কিছু পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদকে বিভিন্ন দেবীশক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রকৃতি, উর্বরতা, শস্য ও কৃষিজীবনের সঙ্গে জড়িত নানা প্রতীকী অর্থ। ভোরে নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে নতুন বস্ত্রে আবৃত করা হয় এবং দেবীর পাশে স্থাপন করা হয়।
অনেকে নবপত্রিকাকে গণেশের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত ‘কলাবউ’ বলে মনে করেন। তবে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় নবপত্রিকা মূলত নয়টি উদ্ভিদে প্রতিফলিত দেবীশক্তির প্রতীক। এই আচার বাংলার দুর্গাপুজোয় প্রকৃতি ও কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রার গভীর যোগের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
৩. অষ্টমী: সন্ধিপুজোর ৪৮ মিনিটের রহস্য
দুর্গাপুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার হল সন্ধিপুজো। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট এই দুই তিথির সন্ধিক্ষণকে ঘিরেই পালিত হয় এই বিশেষ পুজো। অর্থাৎ, প্রচলিত বিধি অনুসারে সন্ধিপুজোর সময়কাল মোট ৪৮ মিনিট।
দেবীমাহাত্ম্য বা মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত চণ্ডীপাঠে চণ্ড ও মুণ্ড নামের অসুরদের বধের কাহিনি রয়েছে। সেই আখ্যান অনুসারে, দেবী চণ্ডিকা তাঁদের বধ করে ‘চামুণ্ডা’ নামে পরিচিত হন। বাংলার সন্ধিপুজোর সঙ্গে এই কাহিনির বিশেষ যোগ রয়েছে। এই সময় বহু পুজোমণ্ডপে ১০৮টি পদ্ম নিবেদন ও ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানোর রীতি দেখা যায়। তবে সব মণ্ডপে আচার পালনের ধরন এক নয়। এই পুজোর মূল তাৎপর্য হল অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়।
৪. নবমী: হোমের আগুনে কীসের প্রতীকী বার্তা?
নবমীর দিন দেবী দুর্গার বিশেষ আরাধনার পাশাপাশি বহু পুজোমণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয় হোম বা যজ্ঞ। বৈদিক ধর্মীয় পরম্পরায় আগুনকে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। হোমের মাধ্যমে মন্ত্রোচ্চারণ ও আহুতি নিবেদন করে দেবতার উদ্দেশে প্রার্থনা জানানো হয়।
দুর্গাপুজোর নবমী হোমের মধ্যেও রয়েছে সেই ধর্মীয় ভাবনা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আচার অশুভের বিনাশ, মঙ্গলকামনা ও শক্তির আরাধনার প্রতীক। তবে হোমের নির্দিষ্ট মন্ত্র, আহুতি ও পদ্ধতি পুজোর রীতি এবং পুরোহিতের নির্দেশ অনুসারে ভিন্ন হতে পারে। নবমী তাই কেবল উৎসবের শেষ দিকের একটি দিন নয়, দেবীর প্রতি ভক্তি ও আত্মশুদ্ধির ভাবনা প্রকাশেরও বিশেষ সময়।
৫. দশমী: বিদায়ের মধ্যেও ফিরে আসার আশ্বাস
দশমী মানেই সিঁদুরখেলা, দেবীবরণ, বিসর্জন আর বিজয়ার প্রণাম। বাংলার প্রচলিত সাংস্কৃতিক বিশ্বাসে দুর্গাপুজোকে দেবীর বাপের বাড়িতে আগমনের উৎসব হিসেবে দেখা হয়। তাই দশমীতে তাঁকে বিদায় জানানোর মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি বিষাদের অনুভূতিও জড়িয়ে থাকে।
বিবাহিত মহিলাদের সিঁদুরখেলা বাংলার বহু পুজোমণ্ডপে পালিত একটি জনপ্রিয় রীতি। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দাম্পত্যের মঙ্গল ও শুভকামনার প্রচলিত বিশ্বাস। তবে এই আচার সর্বত্র একভাবে পালিত হয় না এবং এর সামাজিক রীতিতেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে।
বিসর্জনের মধ্য দিয়ে প্রতিমার আনুষ্ঠানিক পূজার পর্ব শেষ হয়। কিন্তু বিজয়া দশমীর প্রণাম, কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ ও শুভেচ্ছা জানানোর রীতি উৎসবের আনন্দকে আরও কিছুদিন ধরে রাখে। এখানেই দুর্গাপুজোর এক সুন্দর বার্তা বিদায় মানেই চিরবিদায় নয়; নতুন করে ফিরে আসার অপেক্ষাও।
ষষ্ঠীর বোধন থেকে দশমীর বিসর্জন দুর্গাপুজোর প্রতিটি দিনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরাণ, ধর্মীয় আচার, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়। কোনও কোনও কাহিনি পৌরাণিক বিশ্বাসের অংশ, কোনও আচার শাস্ত্রনির্ভর, আবার কিছু রীতি গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের লোকাচারের মধ্য দিয়ে। এই পার্থক্যগুলি বুঝে দুর্গাপুজোকে দেখলে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি তার ঐতিহ্যকেও আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।
