নিউজ ডেস্ক: ইতিহাস ঘাটলে দুর্গা পুজো নিয়ে যেমন অজস্র তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায় তেমনই দেবীর অলঙ্কার নিয়ে আছে পৌরাণিক এবং লোকায়ত সংস্কৃতির কিছু সুন্দর গল্প। দুর্গা পুজোয় দেবীর গয়না কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি এক পরম ঐশ্বরিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ। মা দুর্গার গয়না তৈরি ও তাঁকে সাজানোর পেছনে মূলত দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণের গল্প প্রচলিত আছে; একটি পৌরাণিক সৃষ্টিতত্ত্ব এবং অন্যটি বাংলার ঐতিহ্যবাহী ডাকের সাজ ও বাংলার আঞ্চলিক সংস্কৃতি।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, মহিষাসুরকে বধ করার জন্য যখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিবের সম্মিলিত তেজ থেকে দেবী দুর্গার সৃষ্টি হলো, তখন কেবল অস্ত্র নয়, দেবীকে নানা অলঙ্কারেও ভূষিত করা হয়েছিল। শিবপুরাণ ও দেবী ভাগবত অনুসারে দুর্গাকে গয়না দিয়েছিলেন বিভিন্ন দেবতা।
ক্ষীরোদ সমুদ্র অর্থাৎ সমুদ্রদেব মা-কে দিয়েছিলেন একটি উজ্জ্বল এবং অম্লান রত্নহার, দুটি উজ্জ্বল বস্ত্র, একটি মুকুট, কানের দুল এবং হাতের বালা। অপরদিকে বিশ্বকর্মা দেবীর অঙ্গের মাপ অনুযায়ী সমস্ত অলঙ্কারের নকশা তৈরি করেছিলেন। তিনি দেবীর পায়ে পরিয়ে দিয়েছিলেন উজ্জ্বল নূপুর, গলায় চমৎকার রত্নখচিত পদক এবং হাতের আঙুলগুলির জন্য রত্নখচিত আংটি। অন্যান্য দেবগণ মিলে দেবীর ১০টি হাতের জন্য বিভিন্ন অলঙ্কার ও বাজুবন্ধ তৈরি করেছিলেন।
পৌরাণিক গল্পের পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতিতে মা দুর্গার গয়না তৈরির সবচেয়ে জনপ্রিয়, প্রচলিত এবং বাস্তব ইতিহাসটি জড়িয়ে আছে "ডাকের সাজ"-এর সাথে। শোলা এবং জরির কাজে প্রাচীনকালে জমিদার বাড়ির পুজোগুলি সেজে উঠতো। মা দুর্গার গয়না তৈরি করা হতো সাদা শোলা দিয়ে। পরবর্তীতে প্রতিমাকে আরও রাজকীয় রূপ দিতে শোলার ওপর রূপোলি ও সোনালি জরি ব্যবহারের চল শুরু হয়। এই সাজের জন্য যে রূপোলি জরি বা জার্মানি সিলভারের পাত ব্যবহার করা হতো, তা আসত জার্মানি থেকে। তৎকালীন সময়ে এই উপাদানগুলি ডাকযোগে জাহাজে করে ভারতে আসত। যেহেতু দেবীর গয়না তৈরির কাঁচামাল 'ডাক' মারফত আসত, তাই এই বিশেষ অলঙ্করণ ও গয়না তৈরির পদ্ধতিকে বলা হয় "ডাকের সাজ"।
বর্তমানে দেখা যায় মা দুর্গার প্রতিমা গড়ার পাশাপাশি মৃৎশিল্পীরা মাটি খোদাই করে দেবীর গায়ে গয়না তৈরি করেন।
দেবতাদের দেওয়া দিব্য অলঙ্কার থেকে শুরু করে বাংলার কৃষ্ণনগর বা কুমোরটুলির শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি শোলা, জরি বা মাটির নিখুঁত গয়না—সবকিছু মিলেই দেবী দুর্গার প্রতি অপরিসীম ভক্তি এবং সৃষ্টিশীলতার দেখা মেলে বাংলায়।





