দিনের আলো ফোটার আগেই পশ্চিমবঙ্গে সক্রিয় হল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)। সোমবার ভোরে পূর্ব বর্ধমানের দুর্গাপুরে একটি বাড়িতে হানা দেন তদন্তকারীরা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় শুরু হয় তল্লাশি। এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে চাঞ্চল্য। প্রশ্ন উঠতে শুরু করে— হঠাৎ এই অভিযান কেন? তদন্তকারীরা কোন সূত্রের খোঁজে?
তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও তথাকথিত 'সাইবার স্লেভারি' (Cyber Slavery) চক্রের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সন্ধানেই এই অভিযান। অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের যুবক-যুবতীদের বিদেশে মোটা বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশে পাঠানো হতো। সেখানে পৌঁছনোর পর তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে জোর করে অনলাইন আর্থিক প্রতারণা ও সাইবার জালিয়াতির কাজে লাগানো হত। অনেকে দেশে ফিরতে চাইলেও সেই সুযোগ পেতেন না।
এই চক্রের তদন্তে ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক অভিযান চালিয়েছে NIA। তদন্তে উঠে এসেছে, মানবপাচারের নেপথ্যে কাজ করছিল একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। ভুয়ো নিয়োগকারী সংস্থা, ট্রাভেল এজেন্ট এবং স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে যুবকদের বিদেশে পাঠানো হতো। তদন্তকারীদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গ থেকেও এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের সন্ধান মিলেছে।
সেই সূত্র ধরেই সোমবার ভোরে দুর্গাপুরের একটি বাড়িতে পৌঁছন NIA-র আধিকারিকরা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় বাড়ির প্রতিটি কোণে তল্লাশি চালানো হয়। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, হার্ড ডিস্ক, পেন ড্রাইভ-সহ একাধিক ডিজিটাল ডিভাইস এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি বাজেয়াপ্ত করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাড়ির সদস্যদের দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদও করেন তদন্তকারীরা। ডিজিটাল তথ্য থেকে আরও বড় নেটওয়ার্কের হদিস মিলতে পারে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা।
NIA-র অনুমান, এই মানবপাচার চক্র শুধু মানুষকে বিদেশে পাঠিয়েই থেমে থাকেনি। বিদেশে বসে পরিচালিত সাইবার প্রতারণা, অর্থ পাচার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও থাকতে পারে। সেই কারণেই তদন্তের পরিধি ক্রমশ বাড়ানো হচ্ছে।
যদিও সোমবারের অভিযানে এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে NIA আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তদন্তকারীদের বক্তব্য, তল্লাশি থেকে উদ্ধার হওয়া নথি ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে রাজ্যের আরও কয়েকটি জায়গায় অভিযান চালানো হতে পারে।
ভোরবেলার এই আকস্মিক অভিযানের পর দুর্গাপুরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। তদন্তকারীদের নজরে ঠিক কী তথ্য এসেছে, আর এই তদন্ত শেষ পর্যন্ত কত বড় মানবপাচার ও সাইবার প্রতারণা চক্রের পর্দাফাঁস করতে পারে, সেদিকেই এখন নজর প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের।