কয়লা চুরির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এ বার ভরসা প্রযুক্তি। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিম বর্ধমানের খনি এলাকায় অবৈধ কয়লা উত্তোলন, সুড়ঙ্গ খনন এবং পাচারচক্রের দৌরাত্ম্য রুখতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পুরোপুরি রাশ টানা যায়নি। সেই পরিস্থিতিতে এ বার আকাশে উড়ল ড্রোন। কোথায় অবৈধ খনন চলছে, কোন পরিত্যক্ত খাদানকে কাজে লাগিয়ে কয়লা তোলা হচ্ছে, কোন রাস্তায় পাচারকারীরা সক্রিয়— সবকিছুর উপর নজর রাখতে ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড (ইসিএল), সিআইএসএফ এবং প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে শুরু হয়েছে বিশেষ ড্রোন অভিযান।
ইসিএল সূত্রের খবর, খনি এলাকার বিস্তীর্ণ অংশে অনেক জায়গাই দুর্গম। আবার বহু পরিত্যক্ত খাদান ও জঙ্গলঘেরা এলাকাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে কয়লা চোরদের চক্র। নিরাপত্তারক্ষীরা পৌঁছনোর আগেই তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। ফলে শুধু স্থলপথে টহল দিয়ে এই চক্রের উপর নজরদারি করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। সেই কারণেই আকাশপথে নজরদারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ড্রোনের সাহায্যে খনি এলাকার প্রতিটি অংশের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোথাও নতুন করে মাটি কাটা হয়েছে কি না, অবৈধ সুড়ঙ্গ তৈরি হয়েছে কি না, সন্দেহজনক গাড়ি বা মানুষের আনাগোনা রয়েছে কি না— সবই খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ড্রোনে ধরা পড়া ছবি বিশ্লেষণ করে অবৈধ কয়লা চুরির সম্ভাব্য ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করারও পরিকল্পনা রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী অভিযানের রূপরেখা তৈরি করবে ইসিএল ও সিআইএসএফ।
কর্তৃপক্ষের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারির ফলে কয়লা চোরদের গতিবিধি আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনে ড্রোনে তোলা ভিডিও ও ছবি তদন্তের প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। এর ফলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ আরও দ্রুত এবং শক্তিশালী করা যাবে বলেই আশা প্রশাসনের।
পশ্চিম বর্ধমানের রানিগঞ্জ-আসানসোল কয়লাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই কয়লা চুরি এবং অবৈধ খনন বড় সমস্যা। অতীতে একাধিকবার পরিত্যক্ত খাদানে অবৈধভাবে কয়লা তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ পাচার হওয়ার অভিযোগও বারবার উঠেছে। এই চক্রের সঙ্গে স্থানীয় দুষ্কৃতী থেকে শুরু করে সংগঠিত পাচারকারীদের যোগ থাকার অভিযোগও নতুন নয়।
সম্প্রতি কয়লা পাচারের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী। তারই অংশ হিসেবে ড্রোন প্রযুক্তিকে আরও সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। ইসিএলের আশা, এই নজরদারির ফলে শুধু কয়লা চুরিই নয়, অবৈধ খনন, পাচারের রুট এবং চক্রের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও চিহ্নিত করা অনেক সহজ হবে।
জাতীয় সম্পদ রক্ষায় প্রযুক্তির এই নতুন কৌশল কতটা সফল হয়, এখন সেটাই দেখার। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— কয়লা চোরদের জন্য খনি এলাকার আকাশও আর নিরাপদ থাকছে না।