ওয়াশিংটন: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টির শক্তি ধরে রাখতে বিপুল অর্থ ঢালছেন ধনকুবের ইলন মাস্ক। চলতি নির্বাচনী পর্বে জুলাই মাস থেকে এখনও পর্যন্ত রিপাবলিকানদের সমর্থনে ২৭৬ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ করেছেন তিনি। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই এই বিপুল অর্থব্যয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। নির্বাচনী অর্থের এই প্রবাহ মাস্ককে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিচিত ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অনুদানদাতাদের অন্যতম করে তুলেছে।
নির্বাচনী অর্থসংক্রান্ত নথি এবং সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্কিন নির্বাচনী পর্বে এখনও পর্যন্ত মাস্কের মোট খরচ প্রায় ৩৬৬ মিলিয়ন ডলার। তার মধ্যে জুলাই থেকে ব্যয় হয়েছে ২৭৬ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অর্থাৎ, নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে রিপাবলিকানদের প্রচারযুদ্ধে আর্থিক শক্তি জোগাতে উল্লেখযোগ্য ভাবে সক্রিয় হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম ধনী এই শিল্পপতি। তাঁর এই পদক্ষেপ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বেড়েছে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলেছে।
কোথায় যাচ্ছে মাস্কের টাকা?
মাস্কের অনুদানের বড় অংশ গিয়েছে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারে সহায়তাকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কাছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সেনেট লিডারশিপ ফান্ড। রিপাবলিকান সেনেট প্রার্থীদের সমর্থনে কাজ করা এই সুপার প্যাক সংগঠনকে প্রায় ১৫৮ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন মাস্ক। মার্কিন নির্বাচনী ব্যবস্থায় সুপার প্যাক এমন এক ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন, যা প্রার্থীদের প্রচারে সহায়তার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় করতে পারে। তবে নিয়ম অনুযায়ী, তারা কোনও প্রার্থীর প্রচার কমিটির সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে সেই অর্থ খরচ করতে পারে না।
এ ছাড়াও নিজের রাজনৈতিক সংগঠন আমেরিকা প্যাককে প্রায় ৭৬ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন মাস্ক। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারে এই সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ, ভোটদানে উৎসাহিত করা এবং নির্বাচনী প্রচারের পরিধি বাড়ানোর মতো কাজে এই ধরনের সংগঠন অর্থ ব্যয় করে থাকে। ফলে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে মাস্কের আর্থিক সহায়তা বড় ভূমিকা নিতে পারে।
টেক্সাসের সেনেট নির্বাচনেও অর্থ ঢেলেছেন তিনি। ওই রাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে সমর্থনকারী লোন স্টার লিবার্টি প্যাককে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন মাস্ক। এই নির্বাচন রিপাবলিকানদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইয়ে কয়েকটি রাজ্যের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ
মাস্কের এই বিপুল অর্থব্যয়ের পিছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে জেতাতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন মাস্ক। তাঁর অর্থসাহায্য, প্রচার এবং রাজনৈতিক সমর্থন রিপাবলিকান শিবিরের নির্বাচনী কৌশলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল। পরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার সময় মাস্কের ভূমিকা এবং সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়।
তবে ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের সম্পর্ক সব সময় মসৃণ ছিল না। বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছিল। সেই টানাপড়েনের পরেও ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মাস্কের বিপুল অনুদান রিপাবলিকান শিবিরে তাঁর সক্রিয় প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সম্প্রতি ট্রাম্পের কাছ থেকে জাতীয় বিজ্ঞান পদক পাওয়ার ঘটনাও দু’জনের সম্পর্কের বর্তমান সমীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
মাস্ক আগে রাজনৈতিক খাতে ব্যয় কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক অনুদানের পরিসংখ্যান বলছে, সেই অবস্থান থেকে তিনি অনেকটাই সরে এসেছেন। যদিও তাঁর এই অর্থব্যয়কে কেবল ট্রাম্পের প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। মার্কিন কংগ্রেসে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে, তার উপর ভবিষ্যতের আইন প্রণয়ন, করনীতি, প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিধিনিষেধ এবং বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে। সেই কারণেও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মাস্কের আগ্রহ রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই মধ্যবর্তী নির্বাচন?
আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয় কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সেনেটের একাংশের জন্য ভোট হবে। এই নির্বাচনে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও নীতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। অন্য দিকে, ডেমোক্র্যাটরা এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের উপর নজরদারি বাড়াতে এবং সরকারি নীতির বিরোধিতা করতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মাস্কের মতো বিপুল সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির আর্থিক সহায়তা নির্বাচনী প্রচারের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিজ্ঞাপন, ভোটারদের কাছে পৌঁছনো এবং নির্বাচনী সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। রিপাবলিকানরা সেই আর্থিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলিতে প্রচারের জোর বাড়াতে চাইছে।
তবে অর্থের পরিমাণই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে না। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, মূল্যবৃদ্ধি, ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তা এবং ইরানকে ঘিরে চলতে থাকা যুদ্ধের প্রভাব নিয়েও মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এই বিষয়গুলি রিপাবলিকানদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা বাড়ার পিছনেও এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনী অর্থ নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক
মাস্কের বিপুল অনুদান আমেরিকার নির্বাচনে ধনকুবেরদের প্রভাব নিয়ে পুরনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। সমালোচকদের বক্তব্য, বিপুল অর্থসম্পদের অধিকারীরা নির্বাচনী প্রচারে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এতে সাধারণ ভোটারের মতামত এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর বড় দাতাদের স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে প্রযুক্তি, ব্যবসা ও সরকারি নীতির সঙ্গে যুক্ত কোনও শিল্পপতি যখন বিপুল অর্থ ব্যয় করেন, তখন তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে রাজনৈতিক অনুদানের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
মাস্কের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্ন আরও তাৎপর্যপূর্ণ। স্পেসএক্সের মতো সংস্থার ব্যবসা সরকারি চুক্তি ও মহাকাশ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত। ফলে ভবিষ্যতে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা শক্তিশালী হলে মাস্কের সংস্থাগুলির সরকারি চুক্তি, নিয়ন্ত্রণনীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কড়া নজরদারির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে তাঁর নির্বাচনী অনুদানের পিছনে নির্দিষ্ট কোনও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ নেই।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে মাস্কের ২৭৬ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি সাম্প্রতিক ব্যয় শুধু একটি রাজনৈতিক অনুদানের খবর নয়। এটি আমেরিকার নির্বাচনী লড়াইয়ে অর্থের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের সম্পর্ক এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার রিপাবলিকানদের মরিয়া প্রচেষ্টার প্রতিফলন। শেষ পর্যন্ত এই বিপুল অর্থ ভোটের ফল কতটা বদলাতে পারবে, তার উত্তর দেবে নির্বাচনের ফলই।
