নয়াদিল্লি: চাকরি করতে গিয়ে বসের নজরদারি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই নজরদারি যদি পৌঁছে যায় কম্পিউটারের পর্দা পর্যন্ত? কাজের ফাঁকে সহকর্মীর সঙ্গে কী কথা বলছেন, কোন চ্যাট খুলছেন—সবই যদি বস বসে বসে দেখতে পান? তার সঙ্গে যদি যোগ হয় সপ্তাহে সাত দিন কাজ, ছুটি নেই, রাত ২টো পর্যন্ত অফিসে থাকা এবং এক মিনিট দেরি করলেও শাস্তি! এমনই এক কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা সমাজমাধ্যমে তুলে ধরে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন এক কর্মী। তাঁর বর্ণনায়, কয়েক মাস ধরে চলা এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত তাঁকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়।
Reddit-এর ‘ToxicWorkplace’ নামের একটি ফোরামে ‘Such_Cauliflower_937’ নামে এক ব্যবহারকারী নিজের অভিজ্ঞতা লিখেছেন। তাঁর দাবি, চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় তিনি ভেবেছিলেন স্বাভাবিক একটি কর্পোরেট পরিবেশে কাজ করবেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে নাকি উল্টো অভিজ্ঞতা হয়। কর্মীদের মধ্যে ভয়, বসের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং পক্ষপাতের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ তাঁর।
সবচেয়ে বেশি অস্বস্তির জায়গা ছিল অফিসের সিসিটিভি। ওই কর্মীর দাবি, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা দিয়ে বস শুধু কর্মীদের গতিবিধিই দেখতেন না, প্রয়োজনে ক্যামেরা জুম করে কম্পিউটারের স্ক্রিন পর্যন্ত নজরে রাখতেন। এমনকি কর্মীরা কী করছেন, কোন চ্যাটে কী লিখছেন—সেই বিষয়েও নজরদারি চলত বলে অভিযোগ।
তার সঙ্গে ছিল কাজের সময় নিয়ে কড়াকড়ি। কর্মীর দাবি, সপ্তাহে সাত দিনই কাজ করতে হত। সপ্তাহান্তে ছুটি তো দূরের কথা, সরকারি ছুটি বা জরুরি ছুটিরও সুযোগ ছিল না। প্রতিদিন রাত ২টো পর্যন্ত অফিসে থাকতে হত বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
শুধু দীর্ঘ সময় কাজ করানোই নয়, অফিসে ঢোকার সময় নিয়েও ছিল কড়া নজর। ওই কর্মীর দাবি, এক মিনিট দেরি করলেও কখনও কখনও শাস্তি হিসাবে কর্মীকে অফিসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হত। ফলে কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সব সময় ‘বস কী বলবেন’—এই ভয়ও।
রাতের শেষ দিকের সময় নিয়েও তাঁর অভিযোগ বিস্তর। তাঁর দাবি, কাজ শেষ হওয়ার পরও কর্মীদের একসঙ্গে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে হত। সেখানে বস ধূমপান করতে করতে অনুপস্থিত বা আগে অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়া কর্মীদের নিয়ে সমালোচনা করতেন বলে অভিযোগ।
দিনের পর দিন এমন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে করতে শেষ পর্যন্ত মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন ওই কর্মী। কয়েক মাস পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শুধু পদত্যাগপত্র দিয়েই থামেননি। তাঁর দাবি, অফিসে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন, সেই সব অভিযোগ বিস্তারিত ভাবে লিখে একটি ই-মেল তৈরি করেন এবং সেটি গোটা দলের কাছে পাঠিয়ে দেন।
এর পরের ঘটনাটিও তাঁর বর্ণনায় বেশ নাটকীয়। কর্মীর দাবি, পর দিন খুব ভোরে অফিসে পৌঁছে যান তিনি। সেই সময় বস ঘুমিয়ে ছিলেন। কাউকে কিছু না বলে নিজের সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে নেন। কোনও মুখোমুখি সংঘাত বা শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা নয়—চুপচাপ অফিস থেকে বেরিয়ে যান। তাঁর কথায়, সেটিই ছিল দীর্ঘ দিন ধরে চলা সেই কর্মজীবনের ‘শেষ পালানো’।
পরে পোস্টটি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় নানা প্রতিক্রিয়া। অনেকেই ওই কর্মীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ বলেছেন, এমন পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসাই ভাল সিদ্ধান্ত। কেউ আবার সপ্তাহে সাত দিন কাজ এবং রাত ২টো পর্যন্ত অফিসে থাকার দাবিকে ঘিরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। নজরদারি নিয়ে উঠেছে আরও প্রশ্ন—কর্মীদের কাজের মান যাচাই করার নামে ব্যক্তিগত পরিসর কতটা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা যায়?
তবে পুরো ঘটনাটির ক্ষেত্রেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এটি ওই কর্মীর নিজের দাবি ও সমাজমাধ্যমে দেওয়া বর্ণনার উপর ভিত্তি করে তৈরি। তাঁর অভিযোগগুলি স্বাধীন ভাবে যাচাই করা হয়নি। বস বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকেও এই অভিযোগের কোনও পাল্টা বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি।
তবু ঘটনাটি নতুন করে সামনে এনেছে একটি পুরনো প্রশ্ন—কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আর নজরদারির সীমারেখা কোথায়? কাজের সময়, কর্মক্ষমতা কিংবা নিরাপত্তার জন্য নজরদারি এক জিনিস। কিন্তু কর্মীর কম্পিউটার স্ক্রিন, ব্যক্তিগত কথোপকথন থেকে শুরু করে ছুটি ও ব্যক্তিগত সময় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠলে সেই কর্মপরিবেশ কতটা সুস্থ—প্রশ্নটা সেখানেই।
