বন্ধুর পায়ের জাদুতেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল আর্লিং হালান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধে ভাইকিংদের ড্রিম-জার্নি ও সেমিফাইনালের মাঝে দেওয়াল হয়ে দাঁড়ালেন বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে একসময়ের সতীর্থ জুড বেলিংহ্যাম। তাঁর জোড়া গোলে নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল ইংল্যান্ড। আর সেই সঙ্গে মুড়োল নটে গাছটি এবং শেষ হয়ে গেল হালান্ডদের রূপকথার গল্পটাও।
মায়ামির এই মহারণের শুরু থেকেই বলের দখল ছিল ইংল্যান্ডের কাছে। কিন্তু টমাস টুখেলের দল যতটা আধিপত্য বিস্তার করেছিল, গোলমুখে ততটা কার্যকর হতে পারেনি। নরওয়ের পাঁচজনের রক্ষণভাগ ইংরেজ আক্রমণকে বারবার আটকে দেয়। অন্যদিকে জন স্টোনস ও মার্ক গেহির কড়া নজরদারিতে অনেকটাই নিষ্প্রভ ছিলেন আর্লিং হালান্ড। তবে শুধুমাত্র হালান্ডের উপর নির্ভর করে নরওয়ে এতদূর আসেনি, সেটাই আরও একবার প্রমাণ করল তারা। ম্যাচের ৩৫ মিনিটের পর থেকেই পাল্টা আক্রমণের গতি বাড়ায় ভাইকিংরা। ওদেগার্ড ও বার্জের দুর্দান্ত সমন্বয়ে তৈরি আক্রমণ থেকে বল পেয়ে বক্সে ঢুকে অসাধারণ বাঁকানো শটে জর্ডন পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন আন্দ্রেয়াস শেলডেরুপ। দূরপাল্লার সেই গোল বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলের দাবিদার হয়ে থাকতেই পারে।
তবে নরওয়ের সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে বাঁদিক থেকে অ্যান্থনি গর্ডনের বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণ করে এক টার্নে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে জোরালো শটে সমতা ফেরান জুড বেলিংহ্যাম। এরপর হ্যারি কেন বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়।
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার বাড়াতে একসঙ্গে দুটি পরিবর্তন করেন ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল। মাঠে নামেন বুকায়ো সাকা ও স্টিফেন এজে। তাতে ইংল্যান্ডের আক্রমণ আরও ধারালো হলেও গোলের দেখা মিলছিল না। উল্টো দিকে ৫৫ মিনিটে আবারও বল জালে জড়ায় নরওয়ে। কিন্তু ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) সাহায্যে গোল বাতিল করেন রেফারি, কারণ আক্রমণ শুরুর আগে হালান্ডের ফাউলের প্রমাণ মেলে।
এরপর ৭০ থেকে ৭৫ মিনিটের মধ্যে একাধিক সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে ব্যর্থ হয় নরওয়ে। সাকার একটি নিশ্চিত গোলও গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন নরওয়ের ডিফেন্ডাররা। নির্ধারিত সময় ১-১ সমতায় শেষ হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
সেখানেই আবার নায়ক হয়ে ওঠেন বেলিংহ্যাম। ৯৪ মিনিটে মরগান রজার্সের শট নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ড ঠিকমতো ধরে রাখতে না পারায় ফিরতি বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে গোল করেন রিয়াল মাদ্রিদের মিডফিল্ডার। বিশ্বকাপে এটি ছিল তাঁর ষষ্ঠ গোল। গত ম্যাচে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে পেনাল্টি বাঁচিয়ে নায়ক হওয়া নিল্যান্ড এদিন সেই ভুলের জন্যই খলনায়কে পরিণত হন।
শেষদিকে মরিয়া আক্রমণে নামে নরওয়ে। এমনকি হালান্ডকে তুলে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক কৌশলও নেন কোচ। কিন্তু ইংল্যান্ডের রক্ষণ আর ভাঙা যায়নি। ফলে ২-১ গোলের জয় নিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও নরওয়ের এই অভিযান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে শেষ আটে ওঠা থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত চাপে রাখা—প্রতিটি ম্যাচেই তারা নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল ইংল্যান্ড। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হবে আর্জেন্টিনা। ফুটবল বিশ্বের নজর এখন সেই মহারণের দিকেই।