ইউরোপ: একের পর এক বোমাতঙ্কে বিপর্যস্ত ইউরোপের বিমান পরিষেবা। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় বার একাধিক যাত্রীবাহী বিমানে বোমা রাখার হুমকি ঘিরে ছড়াল আতঙ্ক। বৃহস্পতিবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রায় ১০টি বিমানে বোমাতঙ্কের খবর সামনে এসেছে। নিরাপত্তার কারণে একাধিক বিমানকে নির্ধারিত গন্তব্যের পরিবর্তে অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করানো হয়েছে। কোথাও জরুরি অবতরণ, কোথাও আবার যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে যাত্রীবাহী বিমানকে নিরাপদে নামানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাত্রীদের নামিয়ে বিমানের ভিতর ও মালপত্রে তল্লাশি চালিয়েছেন বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যেরা।
বৃহস্পতিবারের এই ঘটনাগুলির মধ্যে রয়েছে আয়ারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড, ইতালি, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্রের বিমান পরিষেবা। প্রাথমিক ভাবে কোনও বিস্ফোরক উদ্ধার হওয়ার খবর মেলেনি। তবে একের পর এক হুমকির ঘটনায় ইউরোপের বিমানবন্দরগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। কে বা কারা এই হুমকি পাঠাচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
রোমগামী বিমান নামল ফ্রান্সের সামরিক ঘাঁটিতে
বৃহস্পতিবারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন থেকে ইতালির রোমগামী অ্যার লিঙ্গাসের একটি বিমানে। মাঝ আকাশে বোমাতঙ্কের খবর পাওয়ার পর বিমানটিকে নির্ধারিত গন্তব্যে না নামিয়ে ফ্রান্সের নর্মান্ডির এভ্রু বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করানো হয়। প্যারিসের পশ্চিমে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে ওই বিমানঘাঁটি অবস্থিত।
বিমানটিতে ১৫১ জন যাত্রী এবং ছ'জন কর্মী ছিলেন। সকলকে নিরাপদে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর পর বিমানটির কেবিন ও মালপত্র পরীক্ষা করেন বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যেরা। ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীর তরফেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অন্য দিকে, হেলসিঙ্কি থেকে রোমগামী ফিনএয়ারের একটি বিমানেও বোমাতঙ্ক ছড়ায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতালির বায়ুসেনা দু'টি ইউরোফাইটার যুদ্ধবিমান পাঠায়। যুদ্ধবিমানের পাহারায় নিরাপদে রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে অবতরণ করে যাত্রীবাহী বিমানটি।
বুলগেরিয়ায় তিন বিমানের জরুরি অবতরণ
বুলগেরিয়াতেও একের পর এক বোমাতঙ্কের ঘটনা সামনে এসেছে। সে দেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার তিনটি যাত্রীবাহী বিমানে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সতর্কবার্তা পাওয়ার পর জরুরি অবতরণের ব্যবস্থা করা হয়। কোপেনহেগেন ও মাদ্রিদ থেকে আসা দু'টি বিমানকে রাজধানী সোফিয়ায় অবতরণ করানো হয়।
অন্য একটি বিমান লন্ডন থেকে বুলগেরিয়া আসার পথে প্লভদিভ বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিমানের ভিতরে তল্লাশি চালানো হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। রোমানিয়াতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। মিলান থেকে বুখারেস্টগামী উইজ় এয়ারের একটি বিমানে বোমাতঙ্ক ছড়ানোর পর প্রায় ২০০ যাত্রীকে নামিয়ে আনা হয়।
বুখারেস্টের হেনরি কোয়ান্ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর বিমানটির কেবিন ও মালপত্রের অংশে তল্লাশি চালানো হয়। বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলও সেখানে পৌঁছয়। চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগগামী চারটি বিমানে বোমা রাখার হুমকি পাওয়ার কথাও জানিয়েছে সে দেশের পুলিশ। বিমানগুলি অবতরণের পর বিশেষ তল্লাশির ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি বিমানবন্দরগুলিতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
দু'দিন আগেও সাতটি বিমানে বোমাতঙ্ক
বৃহস্পতিবারের ঘটনাগুলির আগে মঙ্গলবারও ইউরোপের আকাশে একই ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। সে দিন অন্তত সাতটি যাত্রীবাহী বিমান এবং ইজ়রায়েলগামী একটি প্রমোদতরিতে বোমা রাখার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। রায়ানএয়ার, উইজ় এয়ার, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্স এবং পোল্যান্ডের লট এয়ারলাইন্সের বিমানগুলি এই ঘটনায় প্রভাবিত হয়।
পোল্যান্ডের ওয়ারশ বিমানবন্দরে নিরাপত্তার কারণে সাময়িক ভাবে রানওয়ে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। ইতালির রোমে একটি রায়ানএয়ার বিমানকে যুদ্ধবিমানের পাহারায় নামানো হয়। স্পেনের মুরসিয়া বিমানবন্দরেও বোমাতঙ্কের জেরে জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু হয়েছিল।
এমনকি গ্রিসের সাইরোস দ্বীপের কাছে ইজ়রায়েলগামী ‘ক্রাউন আইরিস’ নামে একটি প্রমোদতরিতেও বোমা রাখার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। জাহাজটিতে প্রায় ১,৫০০ জন যাত্রী ও কর্মী ছিলেন। তাঁদের নিরাপত্তার কারণে জাহাজটি খালি করে তল্লাশি চালানো হয়। যদিও সেখানেও কোনও বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
নেপথ্যে কি সাইবার হামলা, বাড়ছে ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ আশঙ্কা
পর পর এই ধরনের ঘটনায় ইউরোপের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, বিমান পরিষেবা, পরিবহণ এবং জরুরি পরিকাঠামোকে নিশানা করে পরিকল্পিত ভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হতে পারে। সামরিক ভাষায় এই ধরনের কৌশলকে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলা হয়।
সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে না গিয়ে সাইবার হামলা, ভুয়ো হুমকি, নাশকতা এবং তথ্য বিভ্রান্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের স্বাভাবিক পরিষেবা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। সম্প্রতি ইউরোপের একাধিক দেশে সুপারমার্কেটের হিমঘর এবং ফ্রান্সের রক্ত সংরক্ষণ কেন্দ্রের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে বিমান পরিষেবায় ধারাবাহিক বোমাতঙ্কের সঙ্গে এই ঘটনাগুলির কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ইউরোপের কয়েকটি দেশের আধিকারিকেরা অতীতে রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে এ ধরনের হাইব্রিড হামলা এবং নাশকতামূলক কার্যকলাপে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছেন। যদিও মস্কো ও তেহরান, দু'পক্ষই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সাম্প্রতিক বোমা-হুমকির পিছনেও কোনও নির্দিষ্ট দেশ বা সংগঠনের হাত রয়েছে বলে এখনও প্রমাণ মেলেনি।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিস্ফোরক না থাকলেও এই ধরনের ভুয়ো হুমকির প্রভাব যথেষ্ট গুরুতর। প্রতিটি সতর্কবার্তার পর বিমান ঘুরিয়ে দেওয়া, যাত্রীদের নামানো, নিরাপত্তা তল্লাশি এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে বিপুল অর্থ ও সময় খরচ হয়। একই সঙ্গে বিমানবন্দর ও জরুরি পরিষেবার উপর চাপ বাড়ে। ফলে অল্প খরচে ভুয়ো হুমকি পাঠিয়েও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, ইউরোপের আকাশে পর পর বোমাতঙ্কের ঘটনায় আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মঙ্গলবারের পর বৃহস্পতিবারও একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় কোনও সংগঠিত চক্র এই হুমকিগুলির নেপথ্যে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। আপাতত প্রতিটি হুমকিকে গুরুত্ব দিয়েই নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রশাসন।




