নিউইয়র্ক: একটা ড্রোনের গতি ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার। উড়তে পারে প্রায় ৬,০০০ মিটার উচ্চতায়। পাল্লা প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। দেখতে ড্রোন, কিন্তু কাজের ধরন ক্রমেই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের কাছাকাছি। তার উপর এক-দু’টি নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে হামলা। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার সামনে রাশিয়ার নতুন ‘গেরান-৫’ ড্রোন যে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্ত্রের গুরুত্ব শুধু তার প্রযুক্তিতে নয়, বরং কম খরচে বিপুল সংখ্যায় তৈরি করে প্রতিরক্ষার উপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করার রুশ কৌশলেই।
রাশিয়ার গেরান পরিবারের শুরুটা হয়েছিল ইরানের শাহেদ-১৩৬ নকশার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা প্রপেলারচালিত ড্রোন দিয়ে। যুদ্ধের প্রথম দিকে এই ধরনের ধীরগতির ড্রোনের মোকাবিলায় ইউক্রেন মোবাইল ফায়ারিং দল, ভারী মেশিনগান, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং স্বল্পপাল্লার ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করত।
ইউক্রেনীয় বাহিনী এক সময়ে পুরনো ধরনের ড্রোনের বিরুদ্ধে ৯০ শতাংশের বেশি বাধাদানের হারও দাবি করেছিল। কিন্তু রাশিয়া সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে—প্রপেলারের বদলে ছোট টার্বোজেট ইঞ্জিন। এখানেই গেরান-৪ ও গেরান-৫-এর বড় পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞ ক্যাটেরিনা বন্ডারের মতে, নতুন সংস্করণগুলির গতি ঘণ্টায় ৩০০-৪০০ কিলোমিটার থেকে শুরু করে গেরান-৫-এর ক্ষেত্রে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। বিভিন্ন সংস্করণের পাল্লা প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার থেকে ৯৫০ কিলোমিটারেরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ, পুরনো শাহেদ-ধরনের ড্রোনের তুলনায় প্রতিরক্ষার হাতে প্রতিক্রিয়ার সময় অনেক কমে যাচ্ছে।
সমস্যা শুধু গতি নয়, উচ্চতাও। পুরনো ড্রোনের বিরুদ্ধে যে মোবাইল দলগুলি কার্যকর ছিল, দ্রুতগতির গেরান-৫ অনেক সময় তাদের কার্যকর পাল্লার বাইরে দিয়ে উড়তে পারে। আবার মাটির কাছাকাছি থাকা ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের পক্ষেও ৫০০-৬০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলা লক্ষ্যকে ধাওয়া করে ধরা কঠিন। ফলে ইউক্রেনকে অনেক ক্ষেত্রে দামি আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আর একটি বিষয়—ইলেকট্রনিক যুদ্ধ। নতুন গেরান সংস্করণগুলিতে এমন ব্যবস্থা যুক্ত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যা শেষ মুহূর্তে ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের যোগাযোগ বা নিয়ন্ত্রণে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর এক ডেপুটি কমান্ডার আরও জানিয়েছেন, এই ড্রোনগুলিকে দূর থেকে পথ ও উচ্চতা পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া সম্ভব। ফলে প্রতিরক্ষার রাডারে একটি নির্দিষ্ট গতিপথ ধরে এগিয়ে আসা লক্ষ্য শেষ মুহূর্তে আচরণ বদলে ফেলতে পারে।
তবে রাশিয়ার আসল শক্তি সম্ভবত ‘গতি + সংখ্যা’-র সমীকরণে। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুনে রাশিয়া প্রায় ৪৫০টি জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করেছিল। অগস্টে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২,৮৫০ হয়েছে। বিভিন্ন হামলার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ড্রোনের প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত জেটচালিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউক্রেনীয় সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে অন্যান্য বিশ্লেষণেও রাশিয়ার মাসিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩,০০০ জেটচালিত গেরান-৪ ও গেরান-৫-এর কাছাকাছি বলে দাবি করা হয়েছে। এই জায়গাতেই বদলে যাচ্ছে আধুনিক যুদ্ধের অর্থনীতি। ধরুন, ৮০০টি ড্রোনের মধ্যে ৯০ শতাংশকে প্রতিহত করা গেল। তবুও প্রায় ৮০টি ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করতে পারে। অর্থাৎ, শুধু ‘কত শতাংশ ড্রোন ধ্বংস হল’—এই হিসাব দিয়ে আর সাফল্য মাপা যাচ্ছে না।
আসল প্রশ্ন হয়ে উঠছে, কতগুলি ড্রোন শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছল এবং সেই প্রতিরোধে ইউক্রেনকে কত দামি অস্ত্র খরচ করতে হল। বন্ডারের মতে, বিপুল সংখ্যার ব্যবহারই এই কৌশলের ভিত্তি। রাশিয়ার হামলার পদ্ধতিও সেই হিসাবেই সাজানো হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য। একই সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে ড্রোন পাঠানো, ডিকয় ব্যবহার, উড়ানের উচ্চতা বদলানো এবং হামলার সময়ের ব্যবধান পরিবর্তন—সব মিলিয়ে ইউক্রেনের রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একসঙ্গে একাধিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র, ইন্টারসেপ্টর, কর্মী এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা খরচ হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে এক বিশেষজ্ঞ ‘প্রতিরক্ষাকেই ক্ষয় করে দেওয়ার কৌশল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এর ফলে রাশিয়ার লক্ষ্য শুধু কোনও একটি সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করা নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, গ্যাস পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা শিল্প, রসদ সরবরাহের পথ—এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর উপর বারবার হামলা চালিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতার উপর চাপ তৈরি করাও কৌশলের অংশ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলার সতর্কতা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। আর এখানেই গেরান-৫-কে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তুলনা—ড্রোন বনাম ক্ষেপণাস্ত্র। কিংস কলেজ লন্ডনের ড্রোন বিশেষজ্ঞ জেমস প্যাটন রজার্সের মতে, ছোট জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করে রাশিয়া এমন একটি অস্ত্র তৈরি করেছে যা ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় সস্তা হয়েও দ্রুতগতির এবং দীর্ঘপাল্লার হামলা চালাতে পারে।
এর ফলে রাশিয়াকে প্রতিটি দূরপাল্লার হামলার জন্য দামি ক্ষেপণাস্ত্রের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে না।
তবে এর অর্থ ক্ষেপণাস্ত্রের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমন নয়। বরং যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা বদলাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, বিপুল সংখ্যক ড্রোন দিয়ে প্রথমে আকাশ প্রতিরক্ষাকে ব্যস্ত ও দুর্বল করা, তারপর বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা শক্তভাবে সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ক্রুজ় বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার—এই ‘মিশ্র’ কৌশল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, ড্রোন হয়তো ক্ষেপণাস্ত্রকে সরিয়ে দিচ্ছে না; বরং একই হামলায় তাদের কাজের ভাগ আলাদা করে দিচ্ছে।
ইউক্রেন অবশ্য পাল্টা প্রযুক্তির সন্ধানে রয়েছে। দ্রুতগতির ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরি, সস্তা গাইডেড মিসাইল, জিপিএস বিভ্রান্ত করা এবং ধীরগতির ইন্টারসেপ্টরকে সামনে থেকে ধাক্কা খাওয়ানোর মতো কৌশল বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হল, জুলাইয়ে নতুন ইন্টারসেপ্টর পরীক্ষা করতে গিয়ে ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেশ কিছু ড্রোন ভেঙে পড়েছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকেও এখন একই গতিতে বিবর্তিত হতে হচ্ছে। এই লড়াইয়ের প্রভাব ইউক্রেনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু অত্যাধুনিক এবং অত্যন্ত দামি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হাজার হাজার সস্তা ড্রোন ঠেকানো কতটা টেকসই, সেই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশের জন্যও সতর্কবার্তা—আকাশ প্রতিরক্ষায় শুধু ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’ অস্ত্র থাকলেই হবে না, বিপুল সংখ্যক সস্তা আক্রমণাত্মক ড্রোনের মোকাবিলায় সস্তা, দ্রুত এবং সংখ্যায় পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
তাই গেরান-৫-এর গুরুত্ব শুধু ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার গতিতে সীমাবদ্ধ নয়। আসল পরিবর্তন ঘটছে যুদ্ধের অর্থনীতিতে। এক দিকে তুলনামূলক কম খরচের, দ্রুত উৎপাদনযোগ্য, দীর্ঘপাল্লার ড্রোন; অন্য দিকে তাকে ঠেকাতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ও সীমিত প্রতিরক্ষা মজুত। যুদ্ধের নতুন প্রশ্ন তাই কে বেশি শক্তিশালী অস্ত্র বানাতে পারে, শুধু তা নয়—কে কম খরচে বেশি সংখ্যায় আক্রমণ করতে এবং তার চেয়েও কম খরচে সেই আক্রমণ ঠেকাতে পারে। ইউক্রেনের আকাশে গেরান-৫ সেই নতুন সমীকরণেরই অন্যতম বড় পরীক্ষা।